সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাংসদ সেলিম ভুইয়া’র মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন শিক্ষা জাতীয়করণ করার। এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছি। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে এর সুফল ভোগ করবে ১৮ কোটি জনতা।
আমরা চাই শিক্ষা জাতীয়করণ নিয়ে নীতিমালা যেন ফাঁদ না হয়। বলা হচ্ছে – আগে নীতিমালা হবে, যোগ্যতা যাচাই হবে, তারপর জাতীয়করণ। এই নীতিমালার গ্যাড়াকলে পড়ে আজ ২০ বছরেও জাতীয়করণ হয়নি, আগামী ২০ বছরেও হবে না। কারণ নীতিমালা মানেই – নয় মণ ঘি জোগাড় করো, তারপর রাধা নাচবে। ঘিও জুটবে না, জাতীয়করণও হবে না।
আমরা শিক্ষকরা এমন নীতিমালা চাই না, আমরা একযোগে ঘোষণা চাই।
আমরা কী চাই?
একদিনে ঘোষণা, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন।
সরকার এক প্রজ্ঞাপনে ঘোষণা দেবে – “বাংলাদেশের সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হলো।” ব্যস, আন্দোলন শেষ, অনিশ্চয়তা শেষ। এরপর বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে, যাতে সরকারের উপর একসাথে আর্থিক চাপ না পড়ে।
আমাদের প্রস্তাবিত ৬ ধাপ:
এই ধাপ হবে বয়সভিত্তিক, যা সবচেয়ে মানবিক ও সাশ্রয়ী।
১ম ধাপ: ৫৫+ বয়সী শিক্ষক – যারা ৫-৬ বছরের মধ্যে অবসরে যাবেন, তাদের আগে জাতীয়করণ। এতে পেনশনের চাপ কমবে, তারা সম্মান নিয়ে বিদায় নেবেন।
২য় ধাপ: ৫০+ বয়সী শিক্ষক
৩য় ধাপ: ৪৫+ বয়সী শিক্ষক
৪র্থ ধাপ: ৪০+ বয়সী শিক্ষক
৫ম ধাপ: ৩৫+ বয়সী শিক্ষক
৬ষ্ঠ ধাপ: ৩০+ বয়সী শিক্ষক
প্রতি ৬ মাস পর পর একটি করে ধাপ বাস্তবায়ন হবে। ৩ বছরের মধ্যে পুরো জাতীয়করণ সম্পন্ন।
এতে সরকারের লাভ কী?
শিক্ষা জাতীয়করণ করলে সরকারের ১০টি বড় সুফল। অনেকে ভাবে জাতীয়করণ মানে সরকারের শুধু খরচ। আসলে হিসাব উল্টো। জাতীয়করণ হলে সরকারের লাভই সবচেয়ে বেশি।
(১) কোটি কোটি টাকা টিউশন ফি সরকারি কোষাগারে আসবেঃ এখন ৩০ হাজার এমপিও প্রতিষ্ঠানের বেতন-ফি, ভর্তি ফি, পরীক্ষা ফি যায় কমিটির পকেটে। জাতীয়করণ হলে বছরে প্রায় ২০০০-৩০০০ কোটি টাকা সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হবে।
(২) নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতি ১০০% বন্ধঃ একজন অফিস সহায়ক নিয়োগেও ১০ লাখ, প্রধান শিক্ষক নিয়োগে ৩০ লাখ – এই বাণিজ্য বন্ধ হবে। সরকারের ভাবমূর্তি বাড়বে।
(৩) শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণঃ এখন সরকার টাকা দেয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ কমিটির হাতে। জাতীয়করণ হলে মন্ত্রণালয়ের সরাসরি আদেশে স্কুল চলবে, কোনো আন্দোলন, তালা, মামলা থাকবে না।
(৪) বৈষম্য দূর, সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়বেঃ ‘এক দেশে দুই নীতি’ – সরকারি স্কুলে ১০ টাকা ফি, এমপিও স্কুলে ৫০০ টাকা। এটা নিয়ে অভিভাবকদের ক্ষোভ। জাতীয়করণ হলে ‘বৈষম্যহীন শিক্ষা’ বাস্তবায়ন হবে, সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।
(৫) ঝরে পড়া রোধ, দক্ষ জনশক্তি তৈরিঃ বেতন কমে গেলে গ্রামের গরিব ছাত্র আর স্কুল ছাড়বে না। ঝরে পড়া ৪০% থেকে ১০% এ নামবে। সরকার ১০ বছর পর দক্ষ জনশক্তি পাবে, বিদেশে রেমিট্যান্স বাড়বে।
(৬) কোচিং ও গাইড ব্যবসা নিয়ন্ত্রণঃ সরকারি শিক্ষক কোচিং বাণিজ্য করতে পারবে না, কঠোর নিয়ম থাকবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই পড়া হবে, অভিভাবকের কোচিং খরচ বাঁচবে।
(৭) ম্যানেজিং কমিটি / গভর্নিং বডির রাজনীতি বন্ধঃ স্কুল-কলেজের কমিটি নিয়ে মারামারি, মামলা, রাজনৈতিক দখলদারি – সারাদেশে হাজার হাজার মামলা চলছে। জাতীয়করণ হলে এই রাজনীতি এক রাতে শেষ।
(৮) শিক্ষার মান এক চাপে বাড়বেঃ এখন এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভালো শিক্ষক থাকতে চায় না। জাতীয়করণ হলে বিসিএস এর মতো মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসবে। সরকারকে আলাদা করে মান উন্নয়ন প্রকল্প করতে হবে না।
(৯) পেনশন ও কল্যাণে সরকারের লাভঃ জাতীয়করণ হলে শিক্ষকদের বেতন থেকে ১০% কর্তন (জিপিএফ, কল্যাণ) সরকারি ফান্ডে জমা হবে। এটা হাজার কোটি টাকার ফান্ড হবে, যা দিয়ে সরকার উন্নয়ন কাজ করতে পারবে।
(১০) আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবেঃ ইউনেস্কো, বিশ্বব্যাংক শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ দেখে। জাতীয়করণ হলে শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ ২% থেকে ৪% দেখাবে, আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত হবে, বিদেশি অনুদান পাওয়া সহজ হবে।
হিসাব করলে দেখা যাবে, ধাপে ধাপে করলে সরকারের অতিরিক্ত খরচ বছরে ৫০০-৭০০ কোটি টাকার বেশি নয়, যা জাতীয় বাজেটে ০.১% ও নয়।
সোজা হিসাব: জাতীয়করণ খরচ নয়, এটা সরকারের সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ।
নীতিমালা দিয়ে হবে না কেন?
কারণ নীতিমালা মানেই বিভাজন, বৈষম্য ।
স্বাধীন দেশে এ বৈষম্য মোটেই কাম্য নয়। বলা হবে – এই প্রতিষ্ঠান যোগ্য, ওইটা অযোগ্য। এই শিক্ষক যোগ্য, ওই শিক্ষক অযোগ্য। অথচ সব প্রতিষ্ঠানকে এমপিও দিয়েছে সরকারই, NTRCA দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে সরকারই। এখন অযোগ্য বললে সরকারের নিজের সিস্টেমকেই অযোগ্য বলা হয়। নীতিমালা হলে মামলা হবে, রিট হবে, আন্দোলন চলতেই থাকবে। “রাধাও নাচবে না।”
তাই আমাদের দাবি স্পষ্ট:
নো নীতিমালা, নো বাছাই। একযোগে জাতীয়করণের ঘোষণা চাই। বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে।
শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, শিক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র যখন দায়িত্ব নেবে, তখন বয়স্ক শিক্ষককে আগে সম্মান দিয়েই শুরু করুক। এটাই হবে মানবিক শিক্ষা দর্শন – “একটি বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা”র সত্যিকারের বাস্তবায়ন।

লেখাপড়া বিডি বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা বিষয়ক বাংলা কমিউনিটি ব্লগ

