আলিম পরীক্ষার রেজাল্টের পর একটা চিত্র এখন কমন – কুরআন, হাদিস, ফিকহে A+, আর ইংরেজি আর ICT তে F। অভিভাবক বলে, ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে তাই ইংরেজিতে কাঁচা। কিন্তু আসল কারণটা ছাত্রের দুর্বলতা নয়, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। এই ফেলের পেছনে দুই ধরনের মাদ্রাসার দুই রকম অংক আছে।
১. Non-MPO আলিম মাদ্রাসা
—————————— ————-
প্রিন্সিপাল পদটাই যখন ব্যবসা।
একটি দাখিল মাদ্রাসা, ছাত্র ১০০ জন নেই, আলিম খুলেই কর্তৃপক্ষ প্রধানকে “প্রিন্সিপাল” বানিয়ে দেন। উদ্দেশ্য কী?
উদ্দেশ্য শিক্ষা নয়। উদ্দেশ্য হলো – ওয়াজের পোস্টারে লেখা যাবে “প্রধান বক্তা: প্রিন্সিপাল হযরত মাওলানা অমুক”। এই একটি শব্দের বাজারমূল্য অনেক। এতে মাহফিলের হাদিয়া বাড়ে, বিদেশ থেকে অনুদানের চিঠিতে ওজন বাড়ে।
এখানে MPO ভুক্তির কোনো তাগিদ নেই। কারণ MPO হলে সরকারি অডিট আসবে, নিয়ম মানতে হবে, যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। তার চেয়ে Non-MPO থাকাই লাভজনক। দান-অনুদান আসবে, কোনো জবাবদিহি নেই। ছাত্র পাশ করলো কি ফেল করলো, তাতে কী আসে যায়? প্রতিষ্ঠান তো চলছে পোস্টারের জোরে, রেজাল্টের জোরে নয়।
ফলে ইংরেজি, ICT এর মতো বিষয়ে একজন ভালো শিক্ষক রাখার প্রয়োজনও তারা মনে করে না। কোনো রকমে অফিস সহকারী, অধ্যক্ষ বা কমিটির আত্মীয় একজনকে দিয়ে ক্লাস চালানো হয়।
২. MPO ভুক্ত মাদ্রাসা:
—————————— —
যোগ্য শিক্ষকের ভয়।
এখানে চিত্রটা আরও কষ্টের। সরকার ইংরেজি ও ICT এর জন্য MPO ভুক্ত শিক্ষকের বেতন দিচ্ছে। কিন্তু বহু প্রতিষ্ঠানে সেই পদে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয় না। কেন?
কারণ একজন যোগ্য, বহিরাগত, খণ্ডকালীন নয় – স্থায়ী ইংরেজি শিক্ষক যদি আসেন, তিনি প্রশ্ন করবেন। তিনি জানতে চাইবেন – ভর্তির টাকা কোথায় যায়?
উপবৃত্তির টাকা কেন সময়মতো দেওয়া হয় না? ফান্ডের হিসাব কেন গোপন?
একজন সচেতন শিক্ষক মানেই প্রধানের অযোগ্যতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা আর অর্থনৈতিক অনিয়ম ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। তাই কৌশল হলো – স্থায়ী নিয়োগ না দিয়ে খণ্ডকালীন, বহিরাগত, দুর্বল একজনকে রাখা, যিনি ২/৩ মাস পরে চলে যাবেন, কোনো প্রশ্ন করবেন না।
আর ফল? যত বেশি ফেল, তত বেশি অজুহাত। “আমরা অবহেলিত, আমাদের ল্যাব নেই, অনুদান দিন।” MPO তো বন্ধ হচ্ছে না, বেতন তো আসছেই। ফেলটা তখন অনুদান আনার নতুন হাতিয়ার হয়ে যায়।
এমনও প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে ICT, English এমপিওযোগ্য শূণ্যপদ থাকার পরও চাহিদা দেওয়া হয় না। কারণ একজন শিক্ষক এলে কোচিং বিলের অংশ কম হবে।
এই ফেলের দায় কার?
ছাত্রের নয়। যে ছেলে আরবি গ্রামার বুঝতে পারে, সে ইংরেজি গ্রামার পারবে না কেন? পারবে, যদি তাকে শেখানো হয়।
আজ আলিম পাশ করা ছেলেটা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজির জন্য বাদ পড়ে, তখন তার দুনিয়া ও আখিরাত দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে ভালো আলেমও হতে পারলো না, ভালো চাকরিও পেল না।
সমাধান কোন পথে?
১. আলিম খুললেই প্রিন্সিপাল নয়, ছাত্র সংখ্যা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদ নির্ধারণ করতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরকে এই “পোস্টার প্রিন্সিপাল” সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
২. MPO ভুক্ত প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ও ICT তে NTRCA এর মাধ্যমে স্থায়ী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করতে হবে। খণ্ডকালীন দিয়ে বছরের পর বছর চালানো যাবে না।
৩. অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। শুধু ওয়াজের পোস্টার দেখে নয়, বিগত ৩ বছরের ইংরেজি ও ICT তে পাশের হার দেখে মাদ্রাসায় ভর্তি করান।
মাদ্রাসা ব্যবসার জায়গা নয়; ইবাদতের জায়গা। যেখানে একজন ছাত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যবসা হয়, সেখানে আল্লাহর রহমত থাকে না।

লেখকঃ ড. মোঃ শরিফুল ইসলাম
গবেষক ও কলামিস্ট, সিলেট
লেখাপড়া বিডি বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা বিষয়ক বাংলা কমিউনিটি ব্লগ

