counter

শাহসূফী মুহাম্মদ নুরুল আবছার শাহ খলিলনগরী (রহ.)প্রেম, ত্যাগ ও আধ্যাত্মিকতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

মানবজাতির ইতিহাসে যুগে যুগে এমন কিছু মহামানবের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাধনা কিংবা আত্মিক উৎকর্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তাঁদের সমগ্র সত্তা নিবেদিত ছিল মানুষের কল্যাণ, আত্মশুদ্ধি এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মহান ব্রতে। হযরত শাহসূফী মুহাম্মদ নুরুল আবছার শাহ খলিলনগরী (রহ.) ছিলেন তেমনি এক বিরলপ্রজ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন ছিল প্রেম, ত্যাগ, রিয়াজত, মানবসেবা ও মারেফতের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

শুভ জন্মক্ষণ

১৯৩৭ সালের এক শুভক্ষণে চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলার ফতেপুর গ্রামের খলিল মুন্সির বাড়ির এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। পিতা মরহুম ইসলাম আহমদ কোম্পানি এবং মাতা হাজেরা খাতুনের স্নেহময় পরিবারে তিনি বেড়ে ওঠেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত-স্বভাব, বিনয়ী, সত্যনিষ্ঠ ও ধর্মপ্রাণ। তাঁর পিতামহ মরহুম মিয়াজান সারাং ছিলেন এলাকার একজন সম্মানিত ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি, যার প্রভাব তাঁর চরিত্র গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

শিক্ষাজীবন

নিজ গ্রামের ফতেপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। মেধা ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করলেও পারিবারিক আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথ দীর্ঘায়িত হয়নি। কিন্তু যাঁদের জন্য আল্লাহ তাআলা বিশেষ অনুগ্রহ নির্ধারণ করে রাখেন, তাঁদের জ্ঞানের দ্বার কখনো রুদ্ধ হয় না। পরবর্তীকালে তিনি যুগশ্রেষ্ঠ আরেফবিল্লাহ হযরত শাহসূফী সৈয়্যদ মুহাম্মদ খলিলুর রহমান মাইজভান্ডারী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে এসে ইলমে লাদুন্নীর অমূল্য সম্পদ অর্জন করেন এবং মারেফতের উচ্চ শিখরে আরোহণ করেন।

কর্মজীবন

সংসারের কঠিন বাস্তবতা তাঁকে অল্প বয়সেই কর্মজীবনে প্রবেশ করতে বাধ্য করে। পরিবারের দারিদ্র্য দূরীকরণ ও আপনজনদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি ড্রাইভিং পেশা গ্রহণ করেন। সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি এ পেশায় সুনাম অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্স্ট ক্লাস ড্রাইভার হিসেবে যোগদান করেন এবং দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তাঁর অন্তর যে আধ্যাত্মিক জগতের এক গভীর আহ্বানে সাড়া দিচ্ছিল, তা ক্রমেই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আধ্যাত্মিক জীবনের সূচনা

তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ১৯৭৫ সালে। এক পারিবারিক জটিলতার কারণে তিনি তাঁর প্রিয় মুর্শিদ হযরত খলিল শাহ (রহ.)-এর দরবারে উপস্থিত হন। মুর্শিদের স্নেহময় আলিঙ্গন এবং একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য—“ফায়সালা ওই যাইবো”—তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। এরপর শুরু হয় তাঁর গভীর রিয়াজত, মুজাহাদা ও আত্মিক সাধনার এক নতুন অধ্যায়।

জগতের মানুষ তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থার গভীরতা উপলব্ধি করতে না পেরে নানা ভুল ধারণা পোষণ করলেও তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রেমে নিমগ্ন এক মজযুব দরবেশ। দীর্ঘ কয়েক বছর জালালী হালতে অতিবাহিত করার পর তিনি সালেক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং আধ্যাত্মিক দীক্ষা, ইরশাদ ও মানবকল্যাণের মহান দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

বৈবাহিক জীবন

১৯৬৮ সালে তিনি ফতেপুর গ্রামের লতিফপাড়া নিবাসী ঠান্ডা মিয়া সারাং বাড়ির মৌলভী মুহাম্মদ ইউনুস ও মজুরা খাতুনের জ্যেষ্ঠ কন্যা মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সংসার জীবনে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ স্বামী, স্নেহশীল পিতা ও দায়িত্বশীল অভিভাবক। তাঁর যোগ্য উত্তরসূরিদের মাধ্যমে আজও তাঁর স্মৃতি, শিক্ষা ও আদর্শ বহমান রয়েছে।

মাসিক মাহফিলের প্রবর্তন

১৯৭৫ সাল থেকেই তিনি মাসিক মাহফিলের প্রচলন করেন, যা পরবর্তীকালে এক বিশাল আধ্যাত্মিক সমাবেশে পরিণত হয়। প্রতি বাংলা মাসের প্রথম দিনে অনুষ্ঠিত এ মাহফিলে হামদ, নাত, মানকাবাত, জিকির, ফাতিহা ও তাবারুক বিতরণের মাধ্যমে অগণিত মানুষ আত্মিক প্রশান্তি লাভ করতেন। আজও তাঁর উত্তরসূরিদের তত্ত্বাবধানে এ মাহফিল ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

খলিল নগরে হিজরত

১৯৮৮ সালে তিনি রাউজানের পূর্বাঞ্চলে হিজরত করে প্রতিষ্ঠা করেন “খলিল নগর”। সময়ের প্রবাহে এটি একটি সুপরিচিত আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়। এখানে তিনি খানকাহ, বৈঠকখানা ও আশেক-ভক্তদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলেন। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তাঁর দরবারে এসে দোয়া, পরামর্শ ও আত্মিক সান্ত্বনা লাভ করতেন। দরিদ্র, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য তাঁর দরজা ছিল সর্বদা উন্মুক্ত।

মসজিদ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা

দ্বীনি শিক্ষা ও মানবকল্যাণে তাঁর অবদান ছিল স্মরণীয়। তাঁর নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠিত হয় হযরত খলিল শাহ (রহ.)-এর আস্তানা শরীফ, খলিলিয়া আজিজিয়া তৈয়্যবিয়া ভান্ডারীয়া জামে মসজিদ এবং খলিলিয়া আজিজিয়া তৈয়্যবিয়া ভান্ডারীয়া ফোরকানিয়া মাদরাসা। এসব প্রতিষ্ঠান আজও ইবাদত, শিক্ষা, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে সমাজে ভূমিকা রেখে চলেছে।

চরিত্র ও আদর্শ

হযরত নুরুল আবছার শাহ খলিলনগরী (রহ.)-এর চরিত্র ছিল নববী আদর্শের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সত্যবাদিতা, দানশীলতা, সহনশীলতা, আতিথেয়তা, ন্যায়পরায়ণতা, বিনয় ও তাকওয়া তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি ছিলেন দুনিয়াবিমুখ, পরহেজগার এবং স্বচ্ছ হৃদয়ের অধিকারী। মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সেবাই ছিল তাঁর জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি।

কারামাত

আউলিয়ায়ে কেরাম সাধারণত নিজেদের কারামাত গোপন রাখতে পছন্দ করেন। তাঁরা কখনোই খ্যাতি বা মর্যাদার উদ্দেশ্যে অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ করেন না; বরং আল্লাহ তাআলাই প্রয়োজনবোধে তাঁর প্রিয় বান্দাদের মর্যাদা ও মানুষের কল্যাণের জন্য কারামাত প্রকাশ করে দেন। হযরত নুরুল আবছার শাহ খলিলনগরী (রহ.)-এর জীবনেও অসংখ্য কারামাত প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু আত্মগোপনপ্রিয় স্বভাব এবং যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে সেসব ঘটনার অনেকগুলো আজ বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে গেছে।

ইন্তেকাল

২০১৭ সালের ৯ জুন, পবিত্র মাহে রমজানের ১৩ তারিখ, শুক্রবার দিবাগত রাত ১১টায় ৮০ বছর বয়সে তিনি তাঁর প্রিয় মুর্শিদের চরণে হাজিরা দিয়ে মহান প্রভুর সান্নিধ্যে গমন করেন।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

তাঁর ইন্তেকালের সংবাদ মুহূর্তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং হাজারো ভক্ত-অনুরাগী গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। পরদিন খলিল নগর দরবার শরীফে বিপুল জনসমাগমের মধ্য দিয়ে তাঁর জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

উপসংহার

আজও তাঁর মাজার শরীফ আধ্যাত্মিক প্রেমিকদের পদচারণায় মুখরিত। তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষা, আদর্শ, ফয়ুযাত ও রুহানি প্রভাব অসংখ্য মানুষের অন্তরে ঈমান, ভালোবাসা ও আল্লাহমুখীনতার আলো জ্বালিয়ে চলেছে। তিনি শুধু একজন পীর বা আধ্যাত্মিক সাধক নন; বরং প্রেম, মানবতা, ত্যাগ ও আল্লাহপ্রেমের এক জীবন্ত ইতিহাস।

যুগ যুগ ধরে তাঁর স্মৃতি ও আদর্শ সত্যসন্ধানী মানুষের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

আল্লাহ তাআলা তাঁর মাকাম বুলন্দ করুন এবং তাঁর ফয়ুযাতের মাধ্যমে আমাদের সবাইকে উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *