মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম
পবিত্র মাহে রমজান শেষে এলো ঈদুল ফিতর। ঈদুল ফিতরের অর্থ হচ্ছে রোজা ভাঙার উৎসব। তবে মুসলমানের আনন্দোৎসব আর অমুসলিমের আনন্দোৎসবে ভিন্নতা রয়েছে। মুমিনরা আনন্দোৎসব করে আল্লাহর পছন্দনীয় আমলের মাধ্যমে। কেননা মুসলমানের জীবন ও চিন্তা হয় আখেরাতকেন্দ্রিক। আসলে ঈদুল ফিতর আনন্দ ও ইবাদত দুটির সমন্বিত রূপ। এ আনন্দ আল্লাহর রহমত ও ক্ষমাপ্রাপ্তির, জাহান্নাম থেকে মুক্তির। এতে নেই কোনো অশ্লীলতা ও পাপ—পঙ্কিলতা। এ আনন্দ শুধুই সওয়াব ও পুণ্যময়তা। সংযুক্ত আছে ইবাদতের নিষ্ঠা ও কর্তব্যের তাগিদ। ধনীর সঙ্গে যেন দুঃখী ও দুস্থরা আনন্দে সমান অংশীদার হয়ে ওঠে, প্রতিষ্ঠিত হয় সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ। এ জন্য ইসলাম ধনীদের ওপর ওয়াজিব করেছে সদকাতুল ফিতর। ঈদের জামাতে শরিক হওয়ার আগেই এই ফিতরা আদায়ের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যাতে উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় সম্পদের সুষম বণ্টনের অনিবার্যতা। ফলে এ আনন্দ ছড়িয়ে যায় হৃদয় থেকে হৃদয়ে। শিশু—কিশোর থেকে আবাল—বৃদ্ধ—বনিতা সবার দেহ—মনে ঈদের ছোঁয়া লাগে। হতদরিদ্র, এতিম ও ছিন্নমূল মানুষের মুখেও হাসি ফোটে কিছু টাকা ও কিছু নতুন কাপড় পেয়ে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল খুবই সুন্দর বলেছেন—

“আজ ভুলে যা তোর দোস্ত—দুশমন হাত মেলাও হাতে
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্বনিখিল ইসলামে মুরিদ”।
মদিনা মুনাওয়ারায় প্রথম ঈদ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় হিজরত করলেন, সেখানে দেখতে পেলেন শিশু—কিশোর, আবাল—বৃদ্ধ, নারী—পুরুষ সবাই বছরে দুদিন আনন্দ—উৎসব করে থাকে। সাহাবিদের মধ্যেও আবেগ—আগ্রহ পরিলক্ষিত হওয়ায় আল্লাহর নির্দেশে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা পালনের ঘোষণা দিলেন।
قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِنَّ اللهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا يَوْمَ الأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ
অর্থাৎ এক্ষণে ঐ দিনের পরিবর্তে আল্লাহ তোমাদেরকে দুটি উত্তম দিন প্রদান করেছেন; ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহার দিন। অধিকাংশ আলেমের মতে, এ ঈদের নামাযের বিধান দ্বিতীয় হিজরিতে প্রবর্তিত হয়েছে। কেননা, দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে রোযা ফরয হয়। মুসলমানরা মদিনায় প্রথম ঈদুল ফিতরের নামায পড়ে দ্বিতীয় হিজরি মোতাবেক ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ বা ৩১ মার্চ। ঈদ উদ্যাপন মদিনায় শুরু হলেও পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে। কালক্রমে অঞ্চল ভেদে এই উৎসবে ভিন্ন ভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা যুক্ত হয়।
ঈদের ফযিলত: প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যখন ঈদুল ফিতরের দিন আসে, তখন আল্লাহ বান্দাদের বিষয়ে ফেরেশতাদের সঙ্গে গর্ব করে বলেন, হে আমার ফেরেশতারা! যে শ্রমিক তার কর্ম পূর্ণ করেছে, তার বিনিময় কী? তারা বলেন, তাদের বিনিময় হলো তাদের পারিশ্রমিক পরিপূর্ণরূপে প্রদান করা। তিনি বলেন, হে আমার ফেরেশতারা! আমার বান্দাগণ তাদের দায়িত্ব—কর্তব্য পালন করেছে, তারপর দোয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছে। আমার সম্মান, করুণা, মাহাত্ম্য ও উচ্চ মর্যাদার শপথ! আমি তাদের প্রার্থনা গ্রহণ করব।’ এরপর আল্লাহ আপন বান্দাদের সম্ভোধন করে বলেন, ‘তোমরা ফিরে যাও, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম এবং তোমাদের মন্দ আমলগুলো নেকিতে পরিবর্তন করে দিলাম।’ (বায়হাকি, খুতবাতুল আহকাম: পৃ ১৬২—১৬৬)
ঈদে নবীজির আমল: ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, নূরনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিনে গোসল করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন, সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে উত্তম পোশাক পরতেন। ঈদুল ফিতরে কিছু মিষ্টি দ্রব্য খেতেন। ঈদুল আযহায় কিছু খেতেন না। কুরবানির গোশত দিয়ে দিবসের প্রথম আহার করতেন। ঈদগাহে এক রাস্তা দিয়ে যেতেন, অন্য রাস্তা দিয়ে আসতেন। ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার সময় আস্তে আস্তে এই তাকবির বলতেন—
اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لَا إلَهَ إلَّا اللَّهُ وَاَللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর; লা—ইলাহা ইল্লাল্লাহু; ওয়াল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর; ওয়ালিল্লাহিল হামদ্।’
আর ঈদুল আযহাতে যাওয়ার সময় উপর্যুক্ত তাকবির উচ্চস্বরে পড়তেন। তিনি ঈদে সাহাবাগণের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। গরিব—দুঃখীদের খোঁজখবর নিতেন। অতঃপর ঈদগাহে গিয়ে অতিরিক্ত ছয় তাকবিরের সঙ্গে দুই রাকাত নামায আদায় করতেন। নামায শেষ করে খুতবা দিতেন। ঈদুল ফিতরের খুতবায় ঈদের করণীয় কাজ এবং ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব বর্ণনা করতেন।
ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়: ঈদে পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানানো শরিয়ত অনুমোদিত একটি বিষয়। বিভিন্ন বাক্য দ্বারা এ শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়। সর্বপ্রথম একে অন্যকে সালাম দেবে। কেননা এর চেয়ে উত্তম আর কোনো অভিবাদন হতে পারে না। ইরশাদ হচ্ছে, সালামের মাধ্যমে পরস্পরের মধ্যে মিল—মহব্বত বৃদ্ধি পায়, ঈমানের পূর্ণতা লাভ হয় এবং জান্নাতে প্রবেশ করার পথ সুগম হয়। অতঃপর বলবে ঈদুন সাঈদুন অথবা ঈদুন মুবারকুন।
আত্মীয়কে ঈদ উপহার: নূরনবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘সাধারণ দরিদ্র ব্যক্তিকে সদকা বা দান করলে কেবল সদকার সওয়াব পাওয়া যায়। কিন্তু রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়কে সদকা বা দান করলে সদকাও হবে, আত্মীয়তাও রক্ষা হবে। অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে, সদকা দাতার দ্বিগুণ সওয়াব হবে। সদকার সওয়াব এবং আত্মীয়তা রক্ষা করার সওয়াব। সুতরাং আত্মীয়তার সম্পর্ক বিনষ্ট নয় বরং আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা উত্তম। ঈদ উপহার কিংবা জাকাত—সদকা দেওয়ার মাধ্যমে আপনজনদের সাহায্য—সহযোগিতা করা সুন্নাতে নব্বীর একান্ত দাবি। এতে আত্মীয়দের সম্পর্ক জোরদার হয়। (সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম)
ঈদের হাকীকত: ইবনে রজব হাম্বলী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ঈদের হাকীকত বলেন, ঈদুল ফিতরের দিন সমস্ত উম্মতের জন্য ঈদ ও আনন্দের দিন হওয়ার কারণ হচ্ছে ঐ দিন মহান আল্লাহ তাআলা রোযাদারদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। ফলে যারা গুনাহগার তারাও নেককারদের দলে শামিল হয়ে যায়। তাই রোযাদাররা খুশি হয়ে শুকরিয়া স্বরূপ দান—সদকা করে এবং ঈদের নামায আদায় করে। অথচ ঈদের খুশি উদযাপন করতে গিয়ে অনেক মানুষ গুনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ে। দৃষ্টির গুনাহ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের নাফরমানিতে জড়িয়ে পড়ে, যা বর্জনীয়। আর ঈদুল আযহার দিন বড় ঈদ হওয়ার কারণ হচ্ছে— এর আগের দিন হল আরাফার দিন, যেদিন এত বিপুল পরিমাণ লোকদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়, সারা বছরের আর কোনো দিন এত লোককে মুক্তি দেওয়া হয় না। সুতরাং ঈদের দিন যাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় তার জন্য সেদিন ঈদ ও খুশির দিন আর ঐ দিন যে মুক্তি পায়নি তার জন্য সেদিন কান্না ও বিলাপের দিন। ইমাম ইবনুল জাওযী বলেন—
إخواني: ليس العيد ثوبا يجر الخيلاء جره، ولا تناول مطعم بكف شره لا يؤمن شره، إنما العيد لبس توبة عاص تائب يسر بقدوم قلب غائب.
অর্থাৎ বন্ধুগণ! জমকালো জামা পরা, যা অহংকার সৃষ্টি করে এবং আড়ম্বরপূর্ণ খাবার খাওয়া, যার অনিষ্ট থেকে বাঁচা যাবে না— এর নাম ঈদ নয়; ঈদ হল আল্লাহভোলা কলব তাওবার জামা পরিধান করা, যা অদৃশ্যের (আল্লাহর) সঙ্গে মিলনের আনন্দে আন্দোলিত থাকে।
বঞ্চিত মানুষের মাঝে ঈদ: ফুটপাথই যাদের আবাসস্থল ঈদের দিনে আনন্দের বদলে তাদের চোখে—মুখে থাকে অসহায়ত্বের ছাপ। অনেকে নতুন কাপড় পাওয়ার আশায় অপেক্ষার প্রহর গুণে। ভাসমান এসব মানুষদের নির্দিষ্ট কোনো আশ্রয় থাকে না। আজ এখানে তো কাল ওখানে। ফুটপাথে মাথার ওপর কিছু প্লাস্টিক ও পলিথিন দিয়ে শামিয়ানা টাঙিয়ে কোনো রকমে আবাসের বন্দোবস্ত করে এমন পরিবারও এ শহরেই রয়েছে। একজন মানুষের থাকার জায়গা যেখানে হয় না সেখানে পুরো পরিবারকেই কষ্ট করে দিন পার করতে হচ্ছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে মা বড় করছে আপন সন্তানকে। অনেকের বাবার সন্ধান নেই। বাবাকে চেনেও না। মা টুকটাক কাজ করে সন্তানের আহার যোগাড় করে। কোনো কোনো দিন অনাহারেও থাকতে হয় তাদের। ঈদ এলেই তাদের চেয়ে থাকতে হয় কারও সাহায্যের আশায়। সাহায্য মিললে হয়তো বছরে একদিন নতুন কাপড় পড়ার সৌভাগ্য হয় আর ভাগ্য খারাপ হলে সেটিও জোটে না।
ঈদের বার্তা: ঈদ শুধু একটি আনন্দোৎসব নয়, বরং এটি তাকওয়া, কৃতজ্ঞতা, দানশীলতা এবং সামাজিক সংহতির প্রতীক। কেউ খাবে আর কেউ খাবে না, এ অবস্থার অবসানকল্পে এবং গরিব, সর্বহারা ও অবহেলিত মানুষকে কাছে টেনে নেওয়ার প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষণের দিন হচ্ছে ঈদুল ফিতর। আর এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জান্নাতি সুখের আমেজ। এই বরকতময় দিনে আমাদের উচিত গরিব—দুঃখীদের সহায়তা করা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে নিজেদের নিয়োজিত করা।
মহান আল্লাহ গরিব ও অসহায়দের সঙ্গে সঙ্গে নিজের আপনজনদেরও সাহায্য—সহযোগিতা করার মধ্য দিয়ে ইবাদতের মাধ্যমে সঠিকভাবে ঈদ উদযাপনের তওফিক দান করুন।
লিখক: আরবী প্রভাষক, তাজুশ শরীয়াহ দরসে নিযামী মাদ্রাসা,চট্টগ্রাম;
খতিব, রাজানগর রাণীরহাট ডিগ্রি কলেজ জামে মসজিদ,রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম।
লেখাপড়া বিডি বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা বিষয়ক বাংলা কমিউনিটি ব্লগ

