statistics

নন্দিত কিংবদন্তি ইমাম ও ঘৃণিত স্বৈরাচারী শাসক

মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম

নবী বংশের অনন্য উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং বিলায়তের এক নির্যাসের নাম ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। যিনি ছিলেন বহু সদগুণের আধার। একাধারে সাহাবীয়ে রাসূল,আহলে বায়তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যতম সদস্য,জান্নাতী যুবকদের সরদার। এছাড়াও খোদাভীতি, ইবাদত-বন্দেগী, দানশীলতা, পরোপকারীতা ও উত্তম চরিত্রে তিনি ছিলেন কিংবদন্তি মহামানব।

জন্ম কাল: চতুর্থ হিজরির শা’বান মাসের ৪র্থ দিবস মঙ্গলবার শুভক্ষণে (৮ জানুয়ারি ৬২৬খ্রি:) কুরাইশ রাজবংশের বনু হাশেম গোত্রে মাওলা আলী শেরে খোদা ও ফাতেমা বিনতে রাসূল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার ঔরশে ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জন্ম গ্রহণের পর তাঁর পিতা মহব্বত করে তাঁর নাম রাখেন হারব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জন্মের শুভ সংবাদে শুনে খুবই আনন্দিত হয়ে তাঁকে দেখতে এসে জিজ্ঞেস করলেন নাম কী? হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, তাঁর নাম হারব। তখন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাঁর নাম হারব নয় ; বরং হুসাইন। উপনাম হলো আবু আব্দুল্লাহ। তাঁর একাধিক উপাধি রয়েছে। যেমন ১.সিবতুর রাসূল ২. শহীদ ৩.যকি ৪.সৈয়্যিদুশ শোহাদা ৫. রাশিদ ৬.তাইয়িব ৭.অসি ৮. তক্বি ৯. মুজাহিদ ইত্যাদি। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর তাহনিক করালেন ও তাঁর কানে আযান দিয়েছেন এবং জন্মের সপ্তম দিনে স্বয়ং নিজে একটি মতান্তরে দু’টি মেষ জবেহ করে তাঁর আকীকা দিয়েছেন। এরপর তিনি হযরত ইমাম হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর বেলায় যেমন নির্দেশ দিয়েছিলেন তেমনি হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর মাথার চুল কামিয়ে তাঁর ওজনের সমপরিমাণ রৌপ্য গরীবদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন।  (আল্লামা জামি,শাওয়াহেদুন নবুওয়াত, ইসলামিক পাবলিশার,দিল্লি, পৃ.৪০৯; ড.আ.ন.ম. মুনির আহমদ,আহলে বায়তঃএকটি পর্যালোচনা,শাহাদাতে কারবালা,সংখ্যা ৬ষ্ট,প্রকাশকালঃ ২৭ নভেম্ববর ২০১১,পৃ.৪২;ইবনুল আছির,উসুদুল গাবাহ.দারুল ফিকর,বৈরুত,১৪০৯ হি,খ.১,পৃ.৪৯৬)

অবয়ব: হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর এর চেহারা ছিল খুবই আকর্ষণীয় ও সুন্দর। তিনি যখন কোন অন্ধকারে বসতেন তখন সেখানকার অন্ধকার আলোকিত হয়ে যেতো। তাঁর বক্ষ থেকে পা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে মিল ছিলো। এ প্রসঙ্গে হযরত আলি রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন-
 الحُسَيْنُ أَشبَهُ بِرَسُوْلِ اللهِ –صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ صَدْرِهِ إِلَى قَدَمَيْهِ
অর্থাৎ তাঁর বক্ষ থেকে পা  পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ আলাহিস সালামের সাথে মিল ছিলো।( ইমাম যাহাবি,সিয়ারু আলামিন নুবালা,দারুল হাদিস,কায়রো,১৪২৭হি,খ.৪,পৃ.৩৪৮।)

শিক্ষা জীবন: তিনি দরবারে রিসালত ও বেলায়তের কেন্দ্রস্থলে লালিত পালিত হয়ে একজন যুগশ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীন এবং মুহাদ্দিসে রূপান্তরিত হন। তাঁর যুগের লোেেকরা তাঁর নিকট থেকে ফতোয়া গ্রহণ করতেন। তিনি অত্যন্ত সাবলিল ভাষায় নজির বিহিন বক্তব্য রাখতেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ১২৯ টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি স্বীয় পিতা হযরত আলী,স্বীয় মাতা হযরত ফাতিমা,হযরত উমর ,হযরত হিন্দা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম প্রমুখের নিকট থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকেও অসংখ্য বর্ণনাকারী হাদিস বর্ণনা করেছেন। যেমন- হযরত বিশর বিন গালিব আসদি, হযরত ছুয়াইর বিন আবি ফাখতাহ,স্বীয় ভাই হযরত হাসান,স্বীয় ভাইপো হযরত যায়েদ বিন হাসান,সাঈদ বিন খালিদ, সিনান বিন আবি সিনান, ত্বালহা বিন উবাইদুল্লাহ, হযরত আমির আশ-শাবি, হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর, হযরত উবাইদ বিন হুনাইন, হযরত ইশরামাহ, স্বীয় সন্তান ইমাম যয়নুল আবেদিন, পৌত্র ইমাম বাক্বির, হযরত হুমাম বিন গালিব ফারাযদাক্ব, হযরত ইউসূফ বিন মাইমূন,স্বীয় কন্যা হযরত সকিনা ও ফাতিমা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। ( হাফিয মিজ্জি,তাহযিবুল কামাল, মুয়াসসাসাতুর রিসালা,বৈরুত,১ম সংস্করণ,১৪০০ হি,খ.৬,পৃ.৩৯৭)

গুণাবলী: ইমামে আলী মকাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বহুগুণে গুণান্বিত ছিলেন। যেমন-

১.আল্লাহর রাস্তায় দান ও সদকা:
ইবনে আছাকির বর্ণনা করেছেন, তিনি অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। যখনই তাঁর নিকট কোন ফকির আসত, তখন তাঁর নিকট যা থাকত,তা দিয়ে দিতেন। যেমন একদা এক ফকির তাঁর দরবারে এসে আরজ করলেন,হুজুর,আমি অত্যন্ত গরিব আর আমার পরিবার অনেক বড়। আমার কিছু টাকার প্রয়োজন। ইমামে আলী মকাম এ কথা শুনে তাকে বললেন, তুমি বস। কিছুক্ষণ পর জনৈক ব্যক্তি পাঁচ থলে দিনার নিয়ে তাঁর দরবারে উপস্থিত হলো। ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু পাঁচ থলে দিনার ঐ ফকিরকে দিয়ে দিলেন এবং নিজের জন্য কিছুই রাখেননি।( ইবনে আসাকির, ১৪/১৮৫; আব্দুর রহমান চিশতি, মিরাতুল আসরার, মাকতাবাতু জামে নূর,দিল্লি,১৪১৮ হি,পৃ.২০০-২০১।)
২.গরীব ও মিসকীনদের প্রতি ভালবাসা:
ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর  নিকট তাঁর সহধর্মিনী আরজ করলেন, “আমি আপনার জন্য সুস্বাদু খাবার এবং সুগন্ধি প্রস্তুত করেছি, আপনি আপনার সমপর্যায়ের কাউকে দেখুন এবং তাদেরকে সাথে নিয়ে আমার নিকট তাশরীফ নিয়ে আসুন।” ইমামে হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ُমসজিদে তাশরীফ নিয়ে গেলেন এবং সেখানে যত মিসকিন ছিলো তাদেরকে নিয়ে ঘরে চলে এলেন। প্রতিবেশি মহিলারা তাঁর স্ত্রীর নিকট এসে বলতে লাগলো, আল্লাহর শপথ! আপনার ঘরে তো মিসকিন জমা হয়ে গেছে। অতঃপর  ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নিজের স্ত্রীর নিকট গেলেন এবং বললেন: আমি তোমাকে আমার ঐ হকের শপথ দিচ্ছি, যা আমার প্রতি তোমার রয়েছে যে, তুমি খাবার ও সুগন্ধি বাঁচিয়ে রাখবে না।  অতঃপর তিনি এমনই করলেন। তিনি মিসকিনদের খাবার খাওয়ালেন, তাদেরকে পোশাক পরিধান করালেন এবং সুগন্ধি লাগালেন। (হুসনে আখলাক, ৬২ পৃ.)

ইবাদত ও রিয়াজত: ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বেশি ইবাদত-বন্দেগী করতেন। তিনি দিন-রাত ইবাদতে লিপ্ত থাকতেন। তিনি সর্বদা তাহাজ্জুদ নামায আদায় করতেন এবং কুরআন তেলাওয়াত করতেন আর আল্লাহর স্মরণে সদা মশগুল থাকতেন। এমনকি তিনি শাহাদাত বরণের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত কোন নফল নামাযও ত্যাগ করেননি। তিনি অন্তিম মুহুর্তেও দুই রাকাত নামায আদায় করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনুল আছির বলেন-
وكان الحسين رضي اللَّه عنه فاضلًا كثير الصوم، والصلاة، والحج، والصدقة، وأفعال الخير جميعها
অর্থাৎ হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ছিলেন একাধারে মর্যাদাবান,অত্যাধিক রোযাদার,নামাজ আদায়কারী,হজ্জ্ব পালনকারী,সদকা প্রদানকারী এবং সকল সৎকর্মকারী।( ইবনুল আছির,প্রাগুক্ত,খ.১ম,পৃ.৪৯৮;উসদুল গাবাতি, ২/২৮, নম্বর ১১৭৩ )

দাম্পত্য জীবন: তাঁর দাম্পত্য জীবন খুবই সুন্দর ছিলো। তাঁর কতিপয় স্ত্রী ছিলো। তাঁরা হলেন-শহরবানু, রুবাব বিনতে ইমরুল কায়েস,লায়লা বিনতে আবী মুররাহ আল-সাকাফী, উম্মে ইসহাক বিনতে তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ। তাঁর চার মতান্তরে ছয় ছেলে ও পাঁচ মেয়ে ছিলো। ছেলে সন্তানরা হলেন-১.ইমাম জয়নুল আবেদিন ২.হযরত আলী আকবর ৩.হযরত আলী আসগর ৪. হযরত মুহাম্মদ ৫. হযরত জাফর এবং ৬. আবদুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম। মেয়ে সন্তানরা হলেন-১. হযরত সকিনা বিনতে রুবাব ২.ফাতেমা ৩. যয়নব ৪. হযরত রুকাইয়া ৫. হযরত খাওলা রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুন্না। (মিরাতুল আসরার;কাশফুল গুম্মাহ; ড.আ.ন.ম.মুনির আহমদ,প্রাগুক্ত,পৃ.৪২।) 

সাহসিকতা ও সংগ্রাম: হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ছিলেন অত্যন্ত সাহসী, দৃঢ় মনোবলের অধিকারী, অকুতোভয় সৈনিক। জিহাদের ডাকে প্রয়োজনের মুহূর্তে সাড়া দিতে কখনো পিছপা হতেন না তিনি। তাঁকে একবার হযরত মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর নিকট দূত হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। তিনি সামরিক বাহিনীর সাথে কনস্টান্টিনোপলে (ইস্তাম্বুল অভিযানের) যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এতে হযরত হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর মহত্ত¡ই প্রকাশ পায়। যখনই আল্লাহর পথে যুদ্ধের আহবান এসেছে তখনই তিনি তাতে সাড়া দিয়েছেন, শুধুমাত্র আল্লাহর ধর্মের মর্যাদা রক্ষার জন্যই তিনি তা করেছিলেন।

ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইয়াজিদকে কেন সমর্থন করেননি: সাহাবীয়ে রাসূল হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ওফাতকালে তাঁর পুত্র ইয়াজিদকে আহলে বায়তসহ বনি হাশেমের সকলের সাথে সদাচারণের ওসিয়ত করেন। কিন্তু ৬০ হিজরীতে ইয়াজিদ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর চতুর্দিকে চিঠি লিখে বায়আত গ্রহণের বার্তা পাঠায়। ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তার হাতে বায়াত গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ ইয়াজিদ ছিল দুশ্চরিত্রের, বেনামাজি ও মদ্যপায়ী। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যোবাইর রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমা বলেন, ইয়াজিদ এক প্রতারক, মাতাল ও সত্য পথ পরিত্যাগকারী এবং এমন এক ব্যক্তি যে গায়িকা নারীদের সঙ্গে থাকে। ইমাম যাহাবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইয়াজিদ ছিল ঘৃণ্য নাসিবি তথা আহলে বাইত-বিদ্বেষী। সে মদ পান করত ও পাপাচারে লিপ্ত ছিল। ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে শহীদ করার মাধ্যমে সে তার রাজত্ব শুরু করে এবং মক্কা ও মদীনায় মহাবিপর্যয় ঘটায়। তাই লোকেরা তাকে ঘৃণা করত ও তার জীবনে কোনো বরকত ছিল না। ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর শাহাদতের ঘটনার পর মদীনার অনেকেই আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যই ইয়াজিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। এমনকি ইয়াজিদের দোসর ইবনে জিয়াদও মক্কায় হামলা চালানোর ব্যাপারে তার রাজা ইয়াজিদের হঠকারী নির্দেশে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিল, আল্লাহর শপথ! এক ফাসিকের জন্য আমি দু’টি বিষয় সমন্বিত করব না। আমি এরিমধ্যে নবীর কন্যার সন্তানকে হত্যা করেছি। আর এখন সে (ইয়াজিদ) আমাকে বায়তুল হারামে যুদ্ধ বাধাতে বলছে।  (তাফসিরে মাজহারি, ৫/২১১-১২;বিদায়া ও নিহায়া, ৮/২৭৯,১১৬৯;আল্লামা যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা,৪/৩৭-৩৮;বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন  মাওলানা শাহ আবদুল হক দেহলাভীর লিখিত ‘কারবালার পর পবিত্র মক্কা ও মদীনায় ইয়াজিদি তাণ্ডবলীলা’ শীর্ষক ঐতিহাসিক প্রবন্ধ)

কারবালার ঘটনায় ইয়াজিদের ভুমিকা :
ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে শহীদ করার ব্যাপারে ইয়াজিদ সরাসরি জড়িত ছিল । এ প্রসঙ্গে ইমাম জালাল উদ্দিন সুয়ুতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি  ‘তারিখুল খোলাফা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ইরাকবাসী ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহ আনহু এর কাছে অসংখ্য দূত মারফত পত্রাদি প্রেরণ করে তাকে সেখানে আসতে আহবান করে। অতঃপর হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু  জিলহজ্বের ১০ তারিখ মক্কাশরীফ থেকে ইরাক পথে রওয়ানা দেন। তার সাথে ছিলেন পরিবারের কিছু পুরুষ, মহিলা ও শিশুগণ। এই খবরে ইয়াজিদ উত্তেজিত হয়ে কুফার গভর্ণর নোমান ইবনে বশিরকে (রা.) পদচ্যুত করে ওবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদকে কুফার দায়িত্ব প্রদান করেন। ইমাম হোসাইন (রা.) যেন কোনোভাবেই কুফায় প্রবেশ করতে না পারে সে নির্দেশও দেন ইয়াজিদ।
فكتب يزيد الى واليه بالعراق عبيدالله بن زياد بقتاله
অর্থাৎ, তখন ইয়াজিদ ইরাকের গভর্ণর উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদকে পত্র মারফত নির্দেশ দেয় হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য।
(তারিখুল খোলাফা,  ১৪১ /১৬৫ পৃ.)

মাকতালই খাওয়ারিজমি গ্রন্থে রয়েছে, ইয়াজিদ শাসক হওয়ার পর মদিনায় নিযুক্ত উমাইয়া শাসক ওয়ালিদ ইবনে উতবাকে নির্দেশ দিয়েছিল-“ হুসাইনকে, আবদুল্লাহ ইবনে ওমরকে, আবদুর রহমান ইবনে আবুবকরকে ও আবদুল্লাহ ইবনে যোবাইরকে শক্তভাবে বায়আত করার জন্য পাকড়াও কর। যে-ই বায়আত তথা আমার আনুগত্য প্রকাশ করতে অস্বীকার করবে তার মাথা কেটে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও” (মাকতালই খাওয়ারিজমি, ১ম খণ্ড, ১৭৮-১৮০পৃ.)
ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ কুফায় পৌঁছে সেখানকার জনগণকে কঠোর হস্তে দমন করে এবং মুসলিম বিন আকিলকে হত্যা করে। এরপর ইমাম হোসাইনকে রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু  প্রতিরোধ করতে চার হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করে। বস্তুত হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু  যুদ্ধ করার উদ্দেশ্য নিয়ে রওনা হন নি, বরং কুফাবাসীর আহবানে সাড়া দিতে বের হয়েছিলেন। তিনি কখনোই যুদ্ধ করতে চায়নি, তাকে জোরপূর্বক যুদ্ধ করতে বাধ্য করা হয়েছে । ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু  বললেন, আমি তো যুদ্ধ করতে আসিনি। তোমরা আমাকে ডেকেছ বলে আমি এসেছি। এখন তোমরা কুফাবাসীরাই তোমাদের বাইয়াত পরিত্যাগ করছ। তাহলে আমাদের যেতে দাও, আমরা মদিনায় ফিরে যাই অথবা সীমান্তে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। অন্যথায় ইয়াজিদের কাছে গিয়ে তার সঙ্গে বোঝাপড়া করি। কিন্তু তাঁকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে আদেশ দেয় ইবনে জিয়াদ। ঘৃণা ভরে এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ।
ফোরাত নদীর পানি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে,তার চোখের সামনে নিজের সন্তানদের শহীদ (হত্যা) করা হয়েছে । ৬ মাসের শিশু আলি আসগার (রাঃ) তীরের আঘাতে তার কোলে শহীদ হয়েছেন । এ সমস্ত কিছু হয়েছে ইয়াজিদের পাঠানো চিঠির জন্য । যুদ্ধ করতে আদেশ দেওয়া মানেই হত্যার আদেশ দেওয়া ।  উবায়দুল্লা ইবনে যিয়াদের স্বীকারোক্তিই তা প্রমাণ বহন করে।  উল্লেখ করেছে,“আমি হুসাইনকে হত্যা করেছি ইয়াজিদের কথায় অন্যথায় সে আমাকে হত্যা করে ফেলবে। সুতরাং আমি হুসাইকে হত্যা করার বিষয়টিকে বেছে নিয়েছি।”(ইবনে আসির,আল কামিল ফিত তারিখ,৩/ ১৯০ ;আহমদ বিন দাউদ আবু হানিফা দিনওয়ারি, আখবার আত তাউল,পৃ.২৭৯ )
এত বড় মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও অনেক ভ্রান্ত মতবাদের মাওলানা বিশেষ করে আহলে হাদিস ভাইয়েরা ইয়াজিদকে নির্দোষ প্রমাণ করার অপচেষ্টা করে চলেছে । তাদের কর্মকান্ড দেখে বোঝা যায় তারাই ইয়াজিদ প্রেমী মানুষ । বস্তুত ইয়াজিদ প্রকাশ্যে ইসলাম বিরোধী অসংখ্য কাজ করেছে, মসজিদে নববীতে ঘোড়া বেধেছে এবং তিনদিন আজান বন্ধ করে দিয়েছে, কাবার গিলাফ জালিয়ে দিয়েছে, মদকে জায়েজ মনে করেছে ইত্যাদি বহু ইসলামবিরোধী হারাম কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল । 

প্রখ্যাত তাবেয়ী হযরত হাসান বসরী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইযাজিদের কুকর্মের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন,যখন ইমামের কর্তিত শির মুবারক আনা হয় তখন ইয়াজিদ তার হাতে থাকা বেতের ছড়িটি দিয়ে ওই পবিত্র শিরে খোঁচা মারতে থাকে। (বিদায়া ও নিহায়া,৭/১২২)
এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে কাসির বলেন, “ইয়াজিদের হাতে একটি বেতের ছড়ি ছিল। সে তা দিয়ে হযরত হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর দাঁত মুবারকের ওপর প্রহার করে দাগ বসিয়ে দেয়। এরপর (অভিশপ্ত) ইয়াজিদ বলে: এর এবং আমাদের  দৃষ্টান্ত হল যেমনটি হুসাইন ইবনুল হারাম মুররি বলেছে: আমাদের কাছে শক্তিমান বহুজনের মস্তক চৌচির করে ফেলা হয় এমতাবস্থায় যে তারা ‘বড় নাফরমান’ ও ‘চরম জালিম’।
অন্য বর্ণনা অনুযায়ী ইয়াজিদ ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র কর্তিত শিরের দু’টি চোখে ও তাঁর নাসিকায় বেত্রাঘাত করেছিল। আর এ দৃশ্য দেখে রাসূল (সা.)’র সাহাবি আবু বারজা (রা.) তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ইয়াজিদকে বলেন: তুমি কি তোমার ছড়ি দিয়ে হুসাইনের দাঁতের সারিতে আঘাত করে দাগ বসিয়ে দিলে? সাবধান! তোমার ছড়িটি তাঁর দাঁতের সারিতে দাগ বসিয়েছে এমন স্থানে যেখানে মুখ রেখে চুষতে দেখেছি আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে। সাবধান রোজ হাশরে তথা বিচার দিবসে তোমার শাফায়াতকারী (বিদ্রূপাত্মক অর্থে) বা সঙ্গী হবে (অভিশপ্ত) ইবনে জিয়াদ। আর হুসাইনের শাফায়াতকারী হবেন খোদ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)। এ কথা বলে তিনি ইয়াজিদের দরবার থেকে বের হয়ে যান। (তাবারি এবং বিদায়া ও নিহায়া,৭ /১৯২; ৫ /২৬৮ ও ৫১৬)

প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, ইয়াজিদের হুকুমে ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে হত্যা করা হয়েছে। যেমনটি ইযাজিদের চিঠির উত্তরে লিখেছিলেন –
فَكَتَبَ إِلَيْهِ ابْنُ عَبَّاسٍ: أَمَّا بَعْدُ فَقَدْ جَاءَنِي كِتَابُكَ، فَأَمَّا تَرْكِي بَيْعَةَ ابْنِ الزُّبَيْرِ فَوَاللَّهِ مَا أَرْجُو بِذَلِكَ بِرَّكَ وَلَا حَمْدَكَ، وَلَكِنَّ اللَّهَ بِالَّذِي أَنْوِي عَلِيمٌ، وَزَعَمْتَ أَنَّكَ لَسْتَ بِنَاسٍ بِرِّي، فَاحْبِسْ أَيُّهَا الْإِنْسَانُ بِرَّكَ عَنِّي فَإِنِّي حَابِسٌ عَنْكَ بِرِّي، وَسَأَلْتَ أَنْ أُحَبِّبَ النَّاسَ إِلَيْكَ وَأُبَغِّضَهُمْ وَأُخَذِّلَهُمْ لِابْنِ الزُّبَيْر، فَلَا وَلَا سُرُورَ وَلَا كَرَامَةَ، كَيْفَ وَقَدْ قَتَلْتَ حُسَيْنًا وَفِتْيَانَ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ مَصَابِيحَ الْهُدَى وَنُجُومَ الْأَعْلَامِ غَادَرَتْهُمْ خُيُولُكَ بِأَمْرِكَ
অর্থাৎ হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু লিখেছেন (ইয়াজিদের উত্তরে) ……তুমি হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে হত্যা করেছো আর সাথে বনি আব্দুল মোত্তালিবের যুবকদের হত্যা করেছো, যারা হেদায়াতের রশ্মি ও পরিচিত তারকার মত ছিল, তোমার হুকুমে তোমার সেনারা তাঁদের উপরে আক্রমন করেছে।” (আল কামিল ফিত তারিখ,৩/ ২২৪)

দ্বিতীয় ওমর নামে খ্যাত উমাইয়া শাসক হযরত ওমর বিন আবদুল আযিয রহমাতুল্লাহি আলাইহির শাসনামলে তাঁর সামনে একদিন এক ব্যক্তি ইয়াজিদকে আমিরুল মুমিনিন (মুমিনদের নেতা) বলে উল্লেখ করায়  তিনি ওই লোকটির ওপর চাবুকের বিশটি আঘাত হানার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ( ইমাম হাজার আসকালানী, তাহজিব আত্বতাহজিব, ৬/৩১৩)

আল্লামা কাজি সানাউল্লাহ পানিপথি সুরা ইব্রাহিমের ২৮ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন,  ইয়াজিদ ও তার সঙ্গীরা আল্লাহর নেয়ামতের কুফরি করেছে এবং রাসূলের আহলে বাইতের বিরুদ্ধে শত্রুতার পতাকা তুলে শেষ পর্যন্ত পৈশাচিকভাবে ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে শহীদ করেছে। সে এতটা শত্রুতা করেছে যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধর্মকেই অস্বীকার করেছে। (তাফসীরে মাজহারী, সূরা ইব্রাহিম, আয়াত: ২৮; সূরা মুহাম্মদ, আয়াত:৫৫) এ প্রসঙ্গে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নাম করা ঐতিহাসিক ইবনে খলদুন বলেন
فلا يجوز نصرة يزيد بقتال الحسين ، بل قتله من فعلات يزيد المؤكدة لفسقه ، والحسين فيها شهيد
“হুসাইনের হত্যার ব্যাপারে ইয়াজিদেকে সমর্থন করা অসম্ভব। বরং হুসাইনের হত্যা ইয়াজিদের কাজ।  আর এ কাজটি এটা তাকে ফাসেক প্রমাণিত করে এবং হুসাইনকে শাহিদ।” (মুকাদ্দামাহ, পৃ. ২৫৪)

কুসতুনতুনিয়া-বিষয়ক হাদীসের অপব্যাখ্যার অপনোদন: হযরত উম্মে হারাম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন,‘নৌযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আমার সাহাবীদের প্রথম দলটি বেহেশতী হবে। [বুখারী: আস সহীহ, হাদীস;১৭৫,২৯২৪;] এ উপরোক্ত হাদীস শরীফের আলোকে কিছু লোক মুসলিম উম্মাহকে ভুল বোঝানোর চেষ্টা করে যে, ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধে প্রথম মুসলিম বাহিনীতে ছিলো। কাজেই, নবীজীর  আশ্বাসের প্রেক্ষিতে সে জান্নাতি ও ক্ষমাপ্রাপ্ত! অথচ তাদের এ দাবি একেবারেই অসত্য বা ভিত্তিহীন।কেননা,আলোচ্য হাদীস শরীফে দু’টি বিষয় পরিষ্কার বর্ণিত হয়েছে-প্রথমত, এ উম্মতের প্রথম নৌবাহিনী। দ্বিতীয়ত, কায়সারের নগরী আক্রমণকারী প্রথম মুসলিম বাহিনী।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,  সিজারের শহরে হামলাকারী প্রথম সেনাদলের মধ্যে ইয়াজিদ ছিল না। প্রথম মুসলিম নৌবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হযরত আমিরে মুয়াবিয়া (রাদ্বিআল্লাহুতা’লা ’আনহু)।হযরত উছমান ইবনে আফফানের (রাদ্বিআল্লাহুতা’লা ’আনহু) শাসনামলে তিনি রোম আক্রমণের অনুমতি চেয়েছিলেন এবং ৩২ হিজরীতে অনুমতি পেয়ে তিনি ইস্তাম্বুলের উদ্দেশ্যে অভিযান পরিচালনা করেন। তখন ইয়াজিদ মাত্র ৬  বছরের শিশু।আর সে ঐ যুদ্ধে অংশ নেয় নি।( ইবনে আছীরের আল-কামিল ফীত তারীখ,৩/২৫; ইবনে কাছীরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া,৭/ ১৭৯) আর হযরত মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর শাসনামলে সেখানে মুসলমানদের প্রথম হামলা হয়েছিল ৪২ হিজরিতে। সহীহ হাদীসে বিবৃত হয়েছে:
عَنْ أَسْلَمَ أَبِي عِمْرَانَ قَالَ: غَزَوْنَا مِنَ الْمَدِينَةِ نُرِيدُ الْقُسْطَنْطِينِيَّةَ، وَعَلَى الْجَمَاعَةِ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ خَالِدِ بْنِ الْوَلِيدِ.

অর্থাৎ হযরত আসলাম আবি ইমরান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন,“আমরা কনস্টানটিনোপোল জয়ের উদ্দেশ্যে মদীনা হতে বের হই। আবদুর রহমান বিন খালেদ বিন ওয়ালিদ ছিলেন এই বাহিনীর প্রধান।”[আবু দাউদ: আস সুনান,২য় খণ্ড,হাদীস নং ২৫১২; আলবানীও এই হাদীসকে সহীহ বলেছে তার ‘তাখরিজ’ পুস্তকে।] এ প্রসঙ্গে ইমাম তাবারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদুর রহমান বিন খালেদ বিন ওয়ালিদের সেনাপতিত্বে ৪৪ হিজরী সালে প্রথম  মুসলিম বাহিনী রোমে (কনস্টানটিনোপোল) প্রবেশ করেন এবং সেখানে গযওয়া (ধর্মযুদ্ধ) সংঘটিত হয়।[তারিখে তাবারী, দারুল মা’আরিফ,কায়রো,৫/২১২] ৪২ থেকে ৪৯ হিজরিতে সেখানে ছয়টি অভিযান চালায় মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী।  আর ইয়াজিদকে কথিত অভিযানে প্রেরণ করা হয় ৫০ হিজরিতে এবং তা ছিল সপ্তম অভিযান। বস্তুত ইয়াজিদ মুসলিম বাহিনীকে ব্যাঙ্গ-বিদ্রূপ করেছিল বলে শাস্তি হিসেবে মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তাকে যুদ্ধে পাঠায়। অর্থাৎ যুদ্ধ করার জন্য তাকে পাঠানো হয়নি বরং শাস্তি হিসেবে সাময়িক নির্বাসনের মধ্যে সময় কাটানোর জন্য। এ প্রসঙ্গে ইবনে আসীর রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন: ৫০ হিজরী সালে হযরত আমীরে মোয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু রোমের (কনস্টানটিনোপোল) উদ্দেশ্যে এক বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেন।তিনি এর দায়িত্বভার অর্পণ করেন সুফিয়ান বিন আউফের প্রতি এবং তাঁর ছেলে ইয়াযীদকে ওই বাহিনীর সাথে যেতে বলেন।কিন্তু এয়াযীদ ‘অসুস্থ হওয়ার ভান করে এবং যেতে অস্বীকৃতি জানায়’। যোদ্ধারা যখন ক্ষুধা ও রোগ-ব্যাধিগ্রস্ত হন,তখন সে ব্যঙ্গ করে কবিতায় বলে, ‘ফারকুদওয়ানা-এ মহা গযবে তারা পতিত হয়েছে; তাদের জ্বর বা অন্য যা-ই কিছু হোক,তাতে আমার যায় আসে না। কেননা,আমি বসে আছি উচ্চ ফরাশে (ম্যাট্রেস); আর আমার বাহুবন্ধনে আছে উম্মে কুলসুম (ইয়াযীদের স্ত্রীদের একজন)। হযরত আমীরে মোয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু যখন এই কবিতার শ্লোক সম্পর্কে জানতে পারেন,তখন তিনি ইয়াযীদকে শপথ গ্রহণ করতে ও কনস্টানটিনোপোলে সুফিয়ান ইবনে আউফের সাথে যোগ দিতে বাধ্য করেন, যাতে করে সেও মুসলিম মুজাহিদদের সাথে কঠিন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।’ (যা ছিল ইয়াযীদের প্রতি শাস্তি সরূপ)। ফলে সে নিরুপায় হয়ে যুদ্ধে গমন করে। ”[তারিখে ইবনে আল-আসীর: ৩/১৩১] সুতরাং নির্ভরযোগ্য ইতিহাস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ইয়াজিদ ক্ষমা প্রাপ্তির শুভ সংবাদ সক্রান্ত হাদীসে অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা, ইয়াজিদ কসতুনতুনিয়ার যে যুদ্ধে শরীক ছিল তার পূর্বেও কসতুনতুনিয়ায় মুসলিম সেনাবাহিনী বেশ কয়েকবার  হামলা করেছিলেন। ।[মুফতি শরিফুল হক আমজাদী,নুজহাতুলকারী শরহে সহীহ বুখারী,৬/ ১৩০ ]

ইয়াযিদকে মনোয়নের কারণে আমিরে রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে মন্দ বলা যাবে কি?:
হজরত মুয়াবিয়া (রা.) যখন জীবন সায়াহ্নে পৌঁছলেন, বিশিষ্ট সাহাবি হজরত মুগিরা ইবনে শু’বা (রা.) যিনি বাইআতে রিদ্ওয়ানে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন, তিনি মুয়াবিয়া (রা.)-কে পরামর্শ দিলেন যে, হজরত ওসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলমানদের যে করুণ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে, তা আপনার সামনেই রয়েছে। তাই আমার পরামর্শ হলো, সব প্রাদেশিক গভর্নরকে ডেকে আপনার জীবদ্দশায়ই ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত নিয়ে উম্মতকে রক্তক্ষয়ী হাঙ্গামা থেকে রক্ষা করুন। এ পরামর্শ আনুযায়ী হজরত মুয়াবিয়া (রা.) সব গভর্নরের কাছে এ মর্মে চিঠি প্রেরণ করলেন যে, আমি জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে গেছি, তাই চাচ্ছি যে, মুসলমানদের কল্যাণে আমার জীবদ্দশায়ই একজন খলিফা নিযুক্ত করে যাব। অতএব তোমরা নিজ নিজ পরামর্শ ও তোমাদের পরামর্শদাতাদের মধ্যে যোগ্য ব্যক্তিদের পরামর্শও লিখে পাঠাও। এতে বেশির ভাগ আমিরই ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার পক্ষে রায় দিলেন। কুফা, বসরা, শাম ও মিসরের লোকেরা ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে নিল। বাকি মক্কা-মদিনার গুরুত্ব বিবেচনা করে মুয়াবিয়া (রা.) স্বয়ং হিজাযে উপস্থিত হয়ে সেখানকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। এতে মক্কা-মদিনার জনসাধারণও ইয়াজিদের বাইয়াত গ্রহণ করে নিলেন। আর হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা.), হুসাইন ইবনে আলী (রা.). ও আব্দুর রহমান ইবনে আবী বকর (রা.)- এ পাঁচজনের ব্যাপারে খেলাফত মেনে না নেওয়ার শঙ্কা থাকায় মুয়াবিয়া (রা.) পৃথক পৃথক প্রত্যেকের সঙ্গে মিলিত হয়ে পরামর্শ করেন। এতে প্রথমোক্ত চারজন এ বলে মেনে নিলেন যে, সব লোক স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে নিলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। শুধু হজরত আবদুর রহমান ইবনে আবী বকর (রা.) এতে দ্বিমত পোষণ করলেন। এভাবে বেশির ভাগ উম্মতের রায় মতে ইয়াজিদের খেলাফত নিশ্চিত হলো। তাই মুয়াবিয়া (রা.)-এর ইন্তেকালের পর ইয়াজিদ থেকে যেসব অন্যায় কাজ সংঘটিত হয়েছিল, তার দায়ভার মুয়াবিয়া (রা.)-এর ওপর বর্তাবে না, বরং ইয়াজিদের অন্যায়ের জন্য তিনি নিজেই দায়ী- (তারিখে ইবনুল আসীর ৩/৯৭-১০০) 

পরিশেষে,ইয়াযীদ যেমন অভিশপ্ত তেমনি ইয়াযীদীরাও অভিশপ্ত,নির্লজ্জ ও অবিবেচক। আর যারা ইয়াযীদের পক্ষে শাফাই গায় তারা ইসলামের দুশমন। ইয়াযীদ কোন মতেই কুসতুনতুনিয়া-বিষয়ক হাদীসের সুসংবাদের আওতায় আসবে না।সে ক্ষমা পাবার উপযোগীও নয়। এমনকি তার পক্ষে পক্ষপাতিত্বকারীদের মতে সিপাহ্সালার থাকলেও নয়। কেননা, তার কুকর্মের কারণে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইমাম নাসাফী  প্রমুখ বলেছেন,ইয়াযীদ কাফির ছিলো।(তাহাফ্ফুযে আক্বাইদ:পৃ: ৬৬০, মিরআত শরহে মিশকাত;শরহে আক্বাইদ;ফতোয়ায়ে রেজভীয়া,৬/১০৭,) আর কাফির কোন সৎকর্মের কারণে মাগফিরাত পায় না। (সূরা নিসা,আয়াত:  ১১) পক্ষান্তরে,হযরত ইমাম হুসাঈন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সত্যের উপর ছিলেন।তিনি ইয়াযীদ ও ইয়াযীদের বাতিল খিলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে ইসলামের গৌরবকেই অক্ষুন্ন রেখেছেন।(মা সাবাতা বিসসুন্নাহ;তাকমীলুল ঈমান;শামে কারবালা) আর হযরত আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একজন ন্যায়পরায়ণ সাহাবী ছিলেন। ইয়াযীদ তাঁর পুত্র ছিলো এবং তাঁর পরবর্তীতে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসক হওয়ার কারণে আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে দায়ী করা যাবে না এবং তাঁর বিরুদ্ধে অশালীন ও অমূলক সমালোচনা করা যাবে না। [মুফতী আহমদ ইয়ার খান নঈমী, সাওয়া-ইক্বে মুহারিক্বাহ্,‘হযরত আমীর মু‘আভিয়া’; তাহাফ্ফুযে আক্বাইদ, পৃ: ৬৬০, মিরআত শরহে মিশকাত,৬ষ্ঠ খন্ড,বাংলা সংস্করণ,পৃ:২০৪]

 সুপ্রিয় ঈমানদার ভাইয়েরা! ইমামে আলী মকাম, ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর প্রতি আমাদের ভালবাসা কেমন? আমরাও একটু ভাবি- মুহাররামুল হারামের দশম রজনী ইমাম আলী মকামের জীবনের শেষ রাত ছিলো, কিন্তু আল্লাহ পাকের ইবাদতের প্রতি তাঁর আগ্রহ দেখুন! আর একেবারে শাহাদতের মুহুর্তেও তিনি আল্লাহ পাকের দরবারে সিজদা অবস্থায় ছিলেন। সুতরাং আমরা ইমাম হুসাইনের গোলামরাও যেনো আমাদের মাহবুবের পদাঙ্ক অনুসরন করে চলে ইবাদত ও রিয়াযত করে নিজের জীবনের দিন রাত অতিবাহিত করে চলি। মনে রাখবেন! হাদীসে পাকে বর্ণিত রয়েছে: বান্দা তারই সাথে হবে, যাকে সে ভালবাসবে, যদি আমরা মুখে ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে ভালবাসার দাবী করে থাকি কিন্তু ইমামে আলী মকামের চরিত্র অনুসরন না করি তবে আমাদের ভালবাসা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

লেখক: আরবি প্রভাষক, রাণীরহাট আল-আমিন হামেদিয়া ফাযিল মাদরাসা; খতিব, রাজানগর রাণীরহাট ডিগ্রি কলেজ জামে মসজিদ,রাঙ্গুনিয়া,চট্টগ্রাম।

পোষ্টটি লিখেছেন: মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম

মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম এই ব্লগে 6 টি পোষ্ট লিখেছেন .

তিনি আরবি প্রভাষক, রাণীরহাট আল আমিন হামেদিয়া ফাযিল মাদরাসা; খতিব, রাজানগর রাণীরহাট ডিগ্রি কলেজ জামে মসজিদ,  রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.