statistics

দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল দুর্যোগ ও করোনায় মেধাশূণ্য হয়ে পড়ছে!

লেখা পড়ায় মন নেই। পড়ার টেবিল থেকে দুরে সড়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় পড়ার টেবিল ছেড়ে ইউটিউব, ফেসবুক, গেমস নিয়ে ব্যস্ত স্কুল, কলেজ ও বিশ্বদ্যিালয়ের শিক্ষার্থীরা। একারণে টেনশনে আছেন অভিবাবক সমাজ। ফলে মেধায় পড়ছে ভাটা। অনেকেই বলছেন মেধাশূন্য হয়ে পড়ছে সারা দেশ বিশেষ করে দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ছাত্র-ছাত্রীদের অটোপাসের প্রবণতা বেড়েছে। বারবার নদী ভাঙনে প্লাবিত হয়ওয়ায় পড়ার টেবিল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিধ্বস্থ উপকূলাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা জীবন-জীবিকার তাগিদে ব্যস্ত আয়-উপার্জনে।
 
অন্যদিকে মোবাইলে আসক্তি বাড়ছে টেবিলবিমুখ শিক্ষার্থীদের। এতে উপকূলাঞ্চলে অদূর ভবিষ্যতে মেধাশূণ্য হওয়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষাবিদরা। কেননা বিশ্লেষকদের মতে, দেশের শিক্ষার মান, অর্থনৈতিক অবস্থা প্রায় দশ বছর পিছিয়ে গেছে। আর সেখানে উপকূলাঞ্চলে প্রতি বছর নদী ভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর করোনা ভাইরাসের অবরুদ্ধ সময় শিক্ষার্থীদের মেধার পরিচর্যায় বড় বাঁধা এমনটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
 
খুলনার উপকূলাঞ্চল কয়রায় গেলো বছরের ২০ মে আম্ফান ও চলতি বছরে ২৬ মে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে ব্যাপক ক্ষতি ও উপজেলার প্রায় সব ইউনিয়ন প্লাবিত হয়। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়ে লক্ষাধিক পরিবার। করোনার মধ্যে পড়ে মরার উপর খাঁড়ার ঘা। উপকূলের শিক্ষার্থীরা তাই ভুলতে বসেছে পড়ার টেবিল আর বই খাতা কী।
 
অভিভাবকরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনা নিয়ে উদাসীন হয়ে পড়েছে। এতে পড়ালেখা ভুলতে বসেছে ছাত্র-ছাত্রীরা। যদিও শিক্ষামন্ত্রী অনলাইন ক্লাস ও অ্যাসাইমেন্টের সাথে শিক্ষার্থীদের সংযুক্ত রাখতে বারবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তাগিদ দিচ্ছেন। কিন্তু তাতে উপকূলীয় শিক্ষার্থীরা কতটুকু লেখাপড়ার সাথে আছে এমনটা নিয়েও সন্দিহান সংশ্লিষ্টরা।
 
শিক্ষার্থীরা বলছে, উপকূলে বারবার নদীর পানিতে ভেসে যাওয়া এবং মহামারী করোনা ভাইরাসের অবরুদ্ধ সময় আমাদেরকে একদিকে যেমন লেখাপড়ায় মারাত্মক বাঁধা সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে জীবিকার তাগিদে ছুটতে হচ্ছে বাবা-মায়ের সাথে নদীতে, বনে বা দিন মজুর খাটতে। আবার বন্যা বা ঝড়-বৃষ্টির সংকেত এলেই তাদের দুশ্চিন্তা বাড়ে। এসব অনিশ্চয়তার কারণে তারা পড়ার টেবিলে মন বসাতে পারছে না। উপকূলে প্রায় শতকরা ৯০জন শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস কী তা বোঝে না। তবে যাদের কাছে স্মার্টফোন রয়েছে তারা ব্যস্ত পাবজি, ফ্রি ফায়ার ইত্যাদি অনলাইন গেম খেলা নিয়ে।
 
সারাদেশের ন্যায় খুলনা উপকূলীয় অঞ্চল কয়রায়ও গত বছর মার্চ মাস থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপকূলীয় কয়রায় ছোট-বড় কোচিং সেন্টারগুলোও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি শিক্ষার্থীদের বাসায় গৃহ শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়াও বন্ধ রয়েছে। এতে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া তো করছে না। উপরন্তু কোচিং, প্রাইভেট বন্ধ হওয়ায় মানবেতর জীবন-যাপন করছে শিক্ষিত বেকার যুবকরা।
 
শিক্ষকরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পড়ালেখার তেমন কোনো সুযোগ পায় না। এছাড়াও একজন শিক্ষার্থীকে অনলাইনে ক্লাস করতে প্রতিমাসে ব্যয় করতে হয় সাতশ থেকে আটশ টাকা। যা উপকূলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের পক্ষে অসম্ভব বলে মনে করছেন খোদ শিক্ষকরাও।
 
কয়রা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী তানিয়া তাবাসুম বলেন, গত বছরের মার্চ মাসে কলেজ বন্ধ হওয়ার পর পড়ার টেবিলে বসা হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ায় পড়ার প্রতি এক ধরনের অনীহা তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে দুবার বেঁড়িবাধ ভাঙায় দীর্ঘদিন পানিবন্দি ছিলাম। এতে ক্ষতি হয়েছে ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট, বই-খাতারও।
 
শিক্ষার্থীর বাবা মুন্না সানা জানান, তার তিন ছেলে-মেয়ে। বড় ছেলে খুলনায় বিএল কলেজে অনার্স করছে। ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে অটোপাসে পাস করেছে। কিন্তু তাদের পড়ালেখার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। ছেলে কলেজ ছুটির পর আর কোনোদিন পড়ার টেবিলে বসেনি। মেয়ে অটোপাস পেয়ে সেও বইবিমুখ হয়ে পড়েছে। শত চেষ্টা করেও তাদের লেখাপড়ায় ফিরাতে পারছি ন। যতবারই তাদের পড়ার কথা বলা হয় ততবারই তারা জানায় স্কুল-কলেজ না খুললে পড়ে কী হবে?
 
শিক্ষক সাইদুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের অটোপাস যেমন একটি যুগোপযোগী ইতিবাচক সিদ্ধান্ত, তেমনি এর নেতিবাচক প্রভাবটাও কম নয়। শিশু শ্রেণি থেকে শুরু করে এইচএসসি যেটাই বলি না কেন, শিক্ষার্থীরাই পড়ার টেবিলে নেই। একমাত্র অভিভাবকরাই পারেন পড়ালেখায় ফিরাতে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে উপকূলের শিক্ষার্থীরা মেরুদণ্ডহীন হতে যাচ্ছে।
 
কয়রার কপোতাক্ষ কলেজের অধ্যক্ষ অদ্রীশ আদিত্য মণ্ডল বলেন, বর্তমান করোনা ও নদী ভাঙনের পরিস্থিতিতে উপকূলের শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে মেধাশূণ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুখবর নয়। প্রাথমিক সমাপনী, জেএসসি, এইচএসসিতে অটোপাস দেয়া হয়েছে। তার মানে এই নয় যে, সব পরীক্ষাই অটোপাস হবে। তিনি বলেন, নতুন সিলেবাস করা হয়েছে শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে বসার জন্য। আর শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফেরাতে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।
 

পোষ্টটি লিখেছেন: MD. IQBAL HOSSAIN

এই ব্লগে 51 টি পোষ্ট লিখেছেন .

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *