বাংলা উপভাষার বিবর্তন ও উদ্ভবের ইতিহাস

মনের ভাব প্রকাশের জন্য মানুষের মুখ অর্থাৎ বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত অর্থবোধক এমন ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি অথবা শব্দ বা শব্দসমষ্টি যা কোন বিশেষ গোষ্ঠী বা জনসমাজে উচ্চারিত এবং অপরের কাছে বোধগম্য তার নাম ভাষা।

মুহাম্মদ আব্দুল হাই এর মতে, ”এক এক সমাজে সকল মানুষের অর্থবোধক ধ্বনির সমষ্টিই ভাষা।’’

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন, “মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনির দ্বারা নিষ্পন্ন কোনো বিশেষ জনসমাজে ব্যবহৃত, স্বতন্ত্রভাবে অবস্থিত তথা বাক্যে প্রযুক্ত শব্দ সমষ্টিকে ভাষা বলে।”

ড. মুনীর চৌধুরী ভাষার সঙ্গায় বলেন, “ভাষা মানুষে মানুষে সম্পর্ক স্থাপনের প্রধানতম সেতু, সামাজিক ক্রিয়া কর্ম নির্বাহের অপরিহার্য মাধ্যম, সভ্যতার সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। ভাষা সাহিত্যের বাহন, ভাবের আধার, অবেগের মুক্তিপথ, চিন্তার হাতিয়ার।”

ভাষাবিজ্ঞানী স্টার্টেভান্ট এর মতে, ”A language is a system of arbitraryvocal symbols by which members of a social group co-operate andinteract.”

উপভাষাকে ইংরেজিতে dialect বলা হয়। এই dialect শব্দিটি French শব্দ dialecte থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। আবার এই dialect শব্দটি Latin শব্দ ও Greek শব্দ dialectocs থেকে এসেছে। শব্দটির অর্থ ছিল “Way of Speaking or Local Language” অর্থাৎ কথার কথা বলার প্রকৃতি বা ধরণ। প্রাচীন ইংরেজি অনুযায়ী উপভাষার অর্থ ছিল ‘’কথা বলার ধরন” অর্থাৎ বিশেষ সম্প্রদায় কর্তৃক অনুসৃত ভাষারূপ।

সুকুমার সেন বলেন, “কোনো ভাষা সম্প্রদায় এর অন্তর্গত ছোটো দলে বা অঞ্চল বিশেষে প্রচলিত ভাষা ছাদকে বলা হয় উপভাষা।” তিনি আরও বলেন, কোনো একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর মানুষ যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষায় কথা বলে তখন তাদের ভাষা সম্প্রদায় বলা হয়ে থাকে।

উপভাষা সম্পর্কে সুকুমার সেন বলেছেন, “কোনো ভাষা সম্প্রদায়ের অন্তর্গত ছোট ছোট দলে বা অঞ্চলে বিশেষে প্রচলিত ভাষাছাঁদকে উপভাষা বলে। পৃথিবীর প্রায় সব ভাষাতেই উপভাষা আছে। উপভাষায় রচিত প্রাচীন মৌখিক সাহিত্যই ‘লোক সাহিত্য’, উপভাষার শব্দাবলির মধ্যে রয়েছে একটি জাতির ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিকর সামাজিক পরিচয়, মূল্য মান ভাষার একান্ত আঞ্চলিক রূপটি আছে উপভাষাতেই, আছে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের প্রাধান্য, বিশেষ অঞ্চলের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ভাষা এবং অকৃত্রিম সারল্য। উপভাষার মধ্যে রয়েছে কোনো ভাষার মূলশক্তি।”

আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ  বলেন, “উপভাষা হচ্ছে ভাষার চলিত রূপের ব্যতিক্রমধর্মী কিন্তু সমভাষার উপ-শাখাভুক্ত ভাষারূপ।”

উপভাষার বিবর্তনে আঞ্চলিক ও সামাজিক প্রভাব:

‘ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভাষাতাত্ত্বিকদের মধ্যে উপভাষা সম্পর্কিত ধারণা খুব স্বচ্ছ ছিলো না। তখন পর্যন্ত আঞ্চলিক ভাষা বা গ্রাম্য ভাষাকে শিষ্ট বা সাধু ভাষার বিকৃত ও ভ্রান্তরূপ বলে বিবেচনা করা হতো। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিভিন্ন ভাষার ইতিহাস বা উদ্ভব ও বিবর্তন স্থির করতে গিয়ে বিভিন্ন ভাষা ও উপভাষার সংগঠন-বিশ্লেষণের মাধ্যমে এ তথ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বিভিন্ন স্ট্যান্ডার্ড বা শিষ্ট ভাষা বিশেষ ঐতিহাসিক বা সামাজিক কারণে কোনো না কোনো উপভাষা থেকেই উদ্ভূত এবং উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা শিষ্ট বা সাধু ভাষার বিকৃত রূপ নয়।

উপভাষাতত্ত্বে অগ্রণী ফরাসিরা; আঞ্চলিক ভাষাতত্ত্বে ইতালিয়ানদের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রথম উপভাষা-মানচিত্র প্রণয়ন করেন জার্মান ভাষাতত্ত্ববিদ জর্জ ওয়েঙ্কার। সমসাময়িককালে ভারতীয় উপমহাদেশে জর্জ গ্রিয়ার্সন ভাষা জরিপ করেন।  গ্রিয়ার্সন বিভিন্ন ভাষা ও উপভাষার নমুনা সংগ্রহ করে তার বিশ্লেষণ কয়েক  খন্ডে ‘লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে ১৯০৩ থেকে ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রকাশ করেন। বাংলা ভাষার উপভাষা পরিচয় ঐ সার্ভের ৫ম খন্ডের ১ম ভাগে প্রকাশিত হয়।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে উপভাষাতত্ত্ব মূলত শব্দের বিশ্লেষণে কেন্দ্রীভূত ছিলো। মুখের ভাষায় প্রচলিত শব্দের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণে উপভাষাতাত্ত্বিকেরা শব্দার্থ, বিকিরণ এবং বাক্যে তাদের ভূমিকা অনুযায়ী শব্দের ইতিহাস পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন। ভৌগোলিক, সামাজিক ও ঐতিহাসিক জ্ঞানের সহায়তায় শব্দের ইতিহাস ব্যাখ্যার এক ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়েছিলো। এছাড়া শব্দের ইতিহাস অনুসন্ধানে জাতীয় মানস এবং পুরাতন ও নতুন ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণাদি সতর্কভাবে পরীক্ষা করা হতো। উপভাষা বিশ্লেষণে একটি ভাষা উদ্ভব ও বিকাশে যেসব উপাদানের সংস্পর্শে আসে সেগুলো সম্পর্কে জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তাও স্বীকৃত হয়।

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শেষ ও প্রথম দিকে ভাষাতাত্ত্বিক ভূগোলের তত্ত্বগত ধারণা ছিলো নিম্নরূপ:

ক. একটি ভাষার উপভাষাগত পার্থক্য প্রধানত শব্দ ও ধ্বনি সংগঠনে পাওয়া যায়, তুলনামূলকভাবে রূপ ও বাক বা ব্যাকরণে পার্থক্য কম।

খ. সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণ ভাষাতাত্ত্বিক পার্থক্যের জন্যে গুরত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ বলা চলে, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় উপভাষার সংখ্যা বেশি কারণ বিভিন্ন সামন্তের অধীনে বিভিন্ন অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতা; অপরদিকে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক শাসনে বিভিন্ন অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতা হ্রাসপ্রাপ্ত হয় ফলে উপভাষার সংখ্যাও কমে যায়।

গ. ভাষাতাত্ত্বিক পার্থক্যের জন্যে ভৌগোলিক অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। সমতল ভূমির তুলনায় পার্বত্য ভূমিতে ভাষাতাত্ত্বিক প্রান্তিক অঞ্চল বেশি। সহজ যোগাযোগের জন্যে একটি ভাষাতাত্ত্বিক উদ্ভব, আগম বা পরিবর্তন সহজেই সমতল ভূমিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে অন্যদিকে একটি পার্বত্য অঞ্চলের ভাষা ভৌগোলিক কারণে সমতল ভূমিতে পরিব্যাপ্ত মূল ভাষার বিকাশ ও বিবর্তন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে।

ঘ. উপভাষা বিলোপ বা অবক্ষয়ের গতি সাম্প্রতিককালে দ্রুততর হয়েছে, কারণ গ্রামের মানুষ শহরের মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি অনুকরণ ও গ্রহণের চেষ্টা করছে। [Milka lvich, ‘Linguistic Geography,’ Trends in Linguistics. The Hague, Mouton, 1970 ]

 

ইতালির নব-ভাষাতত্ত্ববিদরা উপভাষাতত্ত্বে মূল্যবান অবদান রেখেছেন, তাদের তত্ত্বের ভিত্তি ছিলো জার্মান ও ফরাসি ভাষাতাত্ত্বিক ভূগোলতত্ত্ব। নব-ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে একটি ভাষার মধ্যে অশুদ্ধ বলে কিছু নেই, যা টিকে থাকে সবই শুদ্ধ। তাদের মতে, একটি ভাষার বিবর্তন প্রধানত ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক পটভূমি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, সুতরাং তারা উপভাষা বিশ্লেষণে ঐতিহাসিক, সামাজিক ও ভৌগোলিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ করেছেন। তারা সম্পর্কিত উপভাষাসমূহের তুলনামূলক পর্যালোচনায় গুরুত্ব দিয়েছেন। যেসব ভৌগোলিক কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে একটি ভাষার উপভাষা বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয় তার প্রতি খুবই মনোযোগ দেন। এভাবেই ‘এরিয়েল লিঙ্গুইস্টিক্স’ বা আঞ্চলিক ভাষাতত্ত্বের উদ্ভব ঘটে। তারা ভাষার আঞ্চলিক বৈচিত্র্য নিরূপণের জন্যে ‘সেস্ট্রাল’ এবং ‘পেরিফেরাল’ বা কেন্দ্র ও প্রাপ্ত অঞ্চলের যে পার্থক্য নির্দেশ করেন উপভাষার সীমানা নির্দেশের জন্য সে ধারণা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জার্মান, ফরাসি ও ইতালিয়ান উপভাষাবিদরা ভাষার আঞ্চলি বৈচিত্র্য সৃষ্টিকারী বৈশিষ্ট্যসমূহকে উপভাষা মানচিত্রে দৃশ্যমান করে তোলার পদ্ধতিরও উদ্ভাবক।

 

কোনো ভাষারই আঞ্চলিক বৈচিত্র্যসমূহ এক প্রকার নয়, তবে উপভাষা মানচিত্রে যেসব অংশে সমশব্দরেখা কম সেসব অঞ্চলকেই ঐ ভাষার বিভিন্ন উপভাষার কেন্দ্র অঞ্চল বা ‘ফোকাল এরিয়াজ’ বলা হয়। নতুন উদ্ভব বা আগম একটি কেন্দ্র অঞ্চল থেকে উদ্ভূত হয়ে সম্প্রসারিত হয় এবং তা ঐ কেন্দ্র অঞ্চলের প্রভাবিত পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে গৃহীত হয়। একটি উপভাষা অঞ্চলের প্রান্ত বা সীমান্ত অঞ্চলসমূহ উপভাষা বৈশিষ্ট্যের সন্ধি অঞ্চল বা ‘ট্রানজিশান এরিয়াজ,’ আর সম-শব্দরেখা অঞ্চল বহির্ভূত এলাকা সম্প্রসারিত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে দূরবর্তী অঞ্চল বা ‘রেলিক এরিয়াজ’। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক কারণে দূরবর্তী অঞ্চলের সৃষ্টি হতে পারে।  [Winfred P. Lehmann, ‘Broadening of Language Materials.’ Historical Linguistics. New York, Holt, Rinehart and Winston, 1966, P. 126-128.]

বাংলাদেশে উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ অঞ্চলে আর্যভাষা বিস্তারের পূর্বে অস্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠী এবং অন্যান্য অনার্যভাষার প্রচলন ছিলো। অনুমান করা যেতে পারে যে, এসব অঞ্চলে আর্যভাষার প্রচলন হলেও সম্ভবত পূর্ববর্তী অনার্য ভাষাসমূহের প্রভাবে পরবর্তী আর্যভাষার সংগঠনে বেশকিছু পরিবর্তন ঘটে। যার প্রমাণ ধরা পড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন উপভাষায় বিশেষত পূর্ববঙ্গীয়তে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী অনার্য ভাষাসমূহকে বিভিন্ন অঞ্চলের বাংলা ভাষার উপস্তর বলা যেতে পারে। সম্ভবত ঐ কারণেই বাংলাদেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক বাংলা উপভাষায় ঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনির অভাব, স্পৃষ্ট তালব্য ধ্বনির পরিবর্তে ঘৃষ্ট বা উষ্ম দন্ত্য ধ্বনির ব্যবহার, স্বরধ্বনিতে সানুনাসিকতার অভাব এবং তাড়নজাত মূর্ধন্য ধ্বনির অনুপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। এসব ধ্বনিগত উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি আর্যপূর্ব অনার্যভাষাসমূহের ধ্বনি সংগঠনের কারণে হতে পারে।

এ সম্পর্কে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মত, “বাঙলাদেশে আর্যভাষার আগমনের পূর্বে, কোল আর দ্রাবিড়, আর উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে ভোট-চীনা, এই তিনটি ভাষারই অস্তিত্বের প্রমাণ পাই…। আর্যদের আগমনের কালে যে ভাষা দ্রাবিড় আর কোল-ই ছিলো, এই অনুমান মেনে নিতে প্রবৃত্তি হয়…। সমস্ত উত্তর-ভারতময়- বাঙলাদেশকেও ধরে-দ্রাবিড়; আর কোলভাষী লোকদের অবস্থানের পক্ষে প্রমাণ আর যুক্তি বিস্তর আছে।”

[সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ‘বাঙলাভাষা আর বাঙালী জাতের গোড়ার কথা,’ বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৫০, পৃ. ৩৩]

মার্কিন উপভাষাবিদ হ্যানস কুরাথ, ম্যাকডেভিড এবং উইলিয়াম লেবভ ভাষার বৈচিত্র্য অবলোকনে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছেন। তারা ভাষার ভৌগোলিক বা আঞ্চলিক বৈষম্য অপেক্ষা সামাজিক বৈচিত্র্য অবলোকনে অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছেন। সমাজ কাঠামো বা সামাজিক কার্যকারণ কীভাবে ভাষাকে প্রভাবিত করে লিওনার্ড ব্লুমফিল্ড তা বিশ্লেষণ করেছেন। তার মতে, মানবসমাজের ভাষাতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য জনবসতির গভীরতার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং ভাষাভাষীর পারস্পরিক যোগাযোগের ব্যাপকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। পূর্বে ভাষাতাত্ত্বিকরা ভাষা ও পরিবেশগত কারণের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতেন, ব্লুমফিল্ড মানুষের মধ্যে যোগাযোগের ব্যাপারটি ভাষাতাত্ত্বিক ও অভাষাতাত্ত্বিক বিষয়ের মধ্যে মাধ্যমরূপে  চিহ্নিত করেছেন। ভাষার মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক; এমনকি ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষভাবে প্রতিফলিত বলে তিনি মনে করেননি। ঐসব বিষয় মানুষের মৌলিক যোগাযোগকে যতটা চালিত করতে পারে ততটুকুই তা ভাষাকে প্রভাবিত করে। [Leonard Bloomfield, Language, New York, Holt, Rinehart & Winston, 1933]

 

অধুনা সামাজিক ভাষাতত্ত্বের লক্ষ্য ভাষাসমূহের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যবহৃত ভাষার ভিত্তিতে সামাজিক ব্যবস্থাসমূহ তুলনা করা। ভাষার কোন্ রূপ কত লোক কি পরিবেশে ব্যবহার করে থাকে এবং ভাষার বিভিন্ন রূপের প্রতি স্থানীয় মনোভাব কি তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হয়। ঐ বিষয়টি অনুধাবনের জন্যে ভাষার দ্বিমাত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রতি দৃষ্টি দেয়া হয়। যার একটি ভাষার অভ্যন্তরীণ রূপ, অপরটি যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ভাষার ভূমিকা। ভাষার প্রথম বৈশিষ্ট্যে যেসব বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য যাচাই করা হয় সেগুলো হলো, ‘স্টান্ডার্ড’ বা শিষ্টভাষা, ‘ভারনাকুলার’ বা লোকভাষা, ধ্রুপদী এবং মিশ্রভাষা।

ভাষার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য বা যোগাযোগ মাধ্যম রূপে যেসব বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য খোঁজা হয় তা হলো, ব্যক্তি বা শ্রেণীর ভাষা, বৃহত্তর যোগাযোগের ভাষা, পেশা বা ব্যবসা-বাণিজ্যের ভাষা ইত্যাদি। [John J. Gumperz, Introduction, Directions in Socio Linguistics, New York, Holt, Rinehart & Winston, 1972, P 1-25]

আঞ্চলিক উপভাষা:

বিভিন্ন অঞ্চলে যে ভাষা প্রচলিত সেই ভাষাকে আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা বলে। যে ভাষা শিশু প্রাকৃতিক নিয়মে শেখে, যার লিখিত কোন ব্যাকরণ নাই, যে ভাষা অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত হয় সেই ভাষাই আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা। প্রায় ত্রিশ মাইল অন্তর এই পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এই পরিবর্তনে উচ্চারণ দোষ বা নানারকম ভুল থাকে। তাই নদীয়া বা পুরুলিয়া, চাটগাঁ ও ময়মনসিংহের ভাষায় যথেষ্ট ভিন্নতা পাওয়া যায়। আবার কুষ্টিয়ার সঙ্গে কোলকাতা, ত্রিপুরার সঙ্গে চট্টগ্রামের, সিলেটের সঙ্গে আসাম সংলগ্ন অঞ্চলের ভাষার ঐক্যও খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলা ভাষায় অসংখ্য উপভাষা রয়েছে।

তাদের মধ্যে প্রধানগুলো হলো: রাঢ়ি উপভাষা (উত্তর ও দক্ষিণ), ঝাড়খণ্ডি উপভাষা, বরেন্দ্রি উপভাষা (পশ্চিম), কামরূপি উপভাষা (উত্তর ও পশ্চিম) ইত্যাদি। একই আচার রীতিনীতি এমনকি একই সংরক্ষিত এলাকার একই গোত্র বা সমাজের মানুষের একই রকমের ছাঁদের প্রচলিত ভাষাই আঞ্চলিক উপভাষা। একটি ভাষার অন্তর্গত এমন একটি বিশেষরূপ যা একটি বিশেষ অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত থাকে এবং যার সঙ্গে সেই আদর্শ ভাষা বা সাহিত্যিক ভাষার ধ্বনির রূপগত পার্থক্য সৃষ্টি করে।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহও ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’ গ্রন্থে বলেছেন—ভাষার জীবন্তরূপ তাহার কথ্য ভাষায়। স্থান ভেদে বাঙ্গালার কথ্যরূপ নানাবিধ—

অঞ্চল                                              আঞ্চলিক ভাষার নমুনা

খুলনা, যশোহর                                  : অ্যাক জন মানশির দুটো ছাওয়াল ছিল।

মানভূম                                                : এক লোকের দুটো বেটা ছিল।

রাঁচি (সরাকি)                                     : এক লোকের দু বেটারাহে।

সিংহভূমি (ধলভূম)                            : এক লোকের দুটা ছা ছিল।

মেদিনীপুর (দক্ষিণ পশ্চিম)             : এক লোক্কর দুট্টা পো থাইল।

পূর্ণিয়া (সিরিপুরিয়া)                           : এক ঝনের দুই পুআ ছিল।

মালদা                                                   : য়্যাক ঝোন ম্যান্শের দুটা ব্যাটা আছ্লো।

বগুড়া                                                   : য়্যাক ঝনের দুটা ব্যাটা আছিল।

রংপুর                                                    : এক জন ম্যানশের দুইক্না ব্যাটা আছিল্।

ঢাকা                                                      : একন মানশের দুইডা পোলা আছিল।

ময়মনসিংহ                                        : য়্যাক জনের দুই পুৎ আছিল্।

সিলেহেট                                             : এক মানুশর দুই পুয়া আছিল্।

কাছাড়                                                  : এক জন মানুশর দুগুয়া পুয়া আছিল্।

চট্টগ্রাম                                                 : এগুয়া মানশের দুয়া পোয়া আছিল্।

নোয়াখালি                                           : একজনের দুই হুত আছিল।

চট্টগ্রাম (চাকমা)                               : এক জন তুন দিবা পোয়া এল্।

মণিপুর (মায়াং)                                : মুনি আগোর পুতো দুগো আসিল্।

সামাজিক উপভাষা:

সমাজের ব্যবহৃত ভাষাই সামাজিক উপভাষা। অন্যভাবে বলা যায়, সমাজের মধ্যে যেসব ভাষা বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ ব্যবহার করে সেসব ভাষাকে সামাজিক উপভাষাবলে। সামাজিক উপভাষানির্ণয় করার সহজ উপায় মানুষের শিক্ষাদীক্ষার অবস্থান। একজন শিক্ষিত লোক যেভাবে কথা বলে, একজন অশিক্ষিত লোক সেভাবে কথা বলে না। যেভাষা মানুষের সামাজিক পরিচয় বহন করে সেভাষাই সামাজিক উপভাষা। সামাজিক উপভাষাসৃষ্টির প্রধান কারণ হলো সামাজিক শ্রেণি বিভাজন ও সীমারেখার প্রতিবন্ধকতা। নমুনা হিসেবে দেখা যায়, আমি কাজটি করছি/আমি কাজটি করতাছি/আমি কাজটি করতেছি। সমাজে যেসব স্তর আছে তাদের ভাষারীতি আলাদা, ভাষা অভ্যাসও আলাদা।

এই পার্থক্য বক্তা, শ্রোতা, উপলক্ষ্য বা পরিস্থিতি অনুসারে আলাদা হয়। উচু ও নীচু সমাজের ভাষাও আলাদা হয়ে থাকে। অন্যদিকে একই সমাজে বা অঞ্চলে বসবাস করলেও ভাষার ভিন্নতা হতে পারে। যেমন : নারী-পুরুষ অথবা তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়ে) মানুষের ভাষা পার্থক্য দেখা যায়। বয়সের কারণেও ভাষা ব্যবহারের ধরণ আলাদা হতে পারে। বিত্ত, জীবিকা, শিক্ষা ইত্যাদির প্রভাবে মান্য বা শিষ্ট ভাষাও কিছুটা পরিবর্তিত হয়। ফলে সমাজের মধ্যে মান্য ভাষার একাধিকরূপও ব্যবহার হতে থাকে। আর্থিক উন্নতির ফলে সমাজে মানুষের মধ্যে পার্থক্য হয় এবং বিভিন্ন স্তর বা শ্রেণি সৃষ্টি হয়। সেই স্তরে ভাষা অভ্যাসেরও পরিবর্তন হয়। ভাষাবিজ্ঞানী ব্লুমফিল ভাষার এই স্তরকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন : সাহিত্যক আদর্শ, আদর্শ চালিত, প্রাদেশিক আদর্শ, আদর্শের ভাষা, স্থানীয় উপভাষা। সমাজের বিভিন্ন স্তরে এই ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ব্যবহৃত হয়।

ভাষা ও উপভাষার মধ্যকার সম্পর্ক:

উপভাষা প্রধানত ভাষার আঞ্চলিক বৈচিত্র্য বা রূপভেদ। একসময়ে ধারণা করা হতো, শিষ্ট বা স্ট্যান্ডার্ড ভাষাই বিশুদ্ধ আর আঞ্চলিক ভাষা বিকৃত বা অশুদ্ধ। কিন্তু সে ধারণার অবসান হয়েছে। প্রকৃত প্রস্তাবে কোনো ভাষার শিষ্ট বা স্ট্যান্ডার্ড রূপ আঞ্চলিক , সামাজিক উপভাষা থেকে সৃষ্ট। সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণে কোনো ভাষার একটি বিশেষ রূপ বিশেষ মর্যাদা পেয়ে থাকে এবং সেটি শিষ্ট রূপে গৃহীত হয়। প্রায়ই ভাষার এই আধুনিক শিষ্ট রূপটি কৃত্রিম বা মিশ্রিত হয়ে থাকে তুলনামূলকভাবে আঞ্চলিক বা গ্রাম্য বা লোকরূপের মধ্যেই ভাষার প্রাচীন রূপ কিছুটা অবিকৃত থাকে। অর্থাৎ ভাষার পরিবর্তন শিষ্টরূপ অপেক্ষা আঞ্চলিক রূপে কম ঘটে থাকে। ভাষার ইতিহাস পুনর্গঠন আঞ্চলিক রূপ বা উপভাষার মধ্যে নিহিত। ম্যাক্সকূলার বলেছেন, “ভাষার প্রকৃত এবং স্বাভাবিক জীবন তার উপভাষাগুলোতে।”

ভাষা বিজ্ঞানী ড: রামেশ্ব’র শ’ এর মতে, একই ভাষার মধ্যে আঞ্চলিক পৃথক রূপকে উপভাষা বলে। কিন্তু এই আঞ্চলিক পার্থক্য বেড়ে চরমে গেলেই আবার একই ভাষা থেকে একাধিক ভাষার জন্ম হয়। অর্থাৎ আঞ্চলিক রূপগুলি তখন একই ভাষার উপভাষা নয়, তখন সেগুলি স্বতন্ত্র ভাষা। যেমন: বাংলা ও অসমিয়া ভাষা প্রথমে একই ভাষার দুটি উপভাষা ছিল। পরে ক্রমে বঙ্গদেশ ও আসামের ভাষার আঞ্চলিক পার্থক্য যখন বেড়ে গেল তখন বাংলা ও আসামের আঞ্চলিক রূপ দুটিকে পৃথক ভাষারূপে চিহ্নিত করা হল-বাংলা ভাষা ও অসমিয়া ভাষা।  

[সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা, ড: রামেশ্ব’র শ, আনন্দ প্রেস পাবলিকেশন্স, কলকাতা- ২০১৪, পৃ:৬৪৬]

উপভাষার বৈশিষ্ট্য:

                ১। আঞ্চলিকভাবে পৃথক বা সামাজিকভাবে পৃথক জনগোষ্ঠী থেকেই উপভাষার আবির্ভাব।

                ২। উপভাষার বৈচিত্র্য,  ভৌগোলিক বা আঞ্চলিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।       

                ৩। কোনো উপভাষা তার স্বতন্ত্রতা যখন বাড়িয়ে উপভাষা অনেকের কাছে গৃহীত হয়। তখন                

       উপভাষা আঞ্চলিকতার গন্ডি পেরিয়ে যায়। তখন উপভাষাটি আদর্শ ভাষার মর্যাদা পেতে শুরু করে।

                ৪। যে কোনো মানুষের উপভাষা উচ্চারণের নিজস্বতা দেখা যায়। ঐ স্বতন্ত্রতা ঐ অঞ্চলের

            জনগোষ্ঠীর নিজস্বতা রূপে বিবেচিত হয়।

                ৫। উপভাষা পাঠের  মধ্যে দিয়ে কোনো বিশেষ অঞ্চলের মানুষের বৈচিত্র্যপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

পর্তুগিজ ধর্মযাজক মানোএল দা আস্সুস্পাসাঁও ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে ‘ভোকাবুলারিও এম্ ইদিওমা বেন্গাল্লা এ পর্তুগিজ’ নামক বাংলা ভাষার যে প্রথম ব্যাকরণটি ঢাকা জেলার ভাওয়াল পরগানায় বসে রচনা করেছিলেন তাতে ভাওয়াল অঞ্চলের উপভাষা ব্যবহৃত হয়েছিল। ১৭৩৫ খ্রিস্টাব্দে রচিত উক্ত লেখকের ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থ বেদ’ গ্রন্থেও ভাওয়ালের উপভাষা ব্যবহৃত হয়। শতাধিক বছর পূর্বে পূর্ববাংলার উপভাষার রূপ কেমন ছিল তার কিঞ্চিৎ নমুনা মানোএলের ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থ, বেদ’ গ্রন্থে পাওয়া যায়।

আধুনিক শিষ্ট বা কথ্য বাংলার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ঐ সব উপভাষার নিম্নরূপ সাধারণ ধ্বনিতাত্ত্বিক ও রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য গ্রীয়ার্সন অনুসরণে মুনীর চৌধুরী নির্দেশ করেছেন।ৎ

ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য:

তাড়নজাত মূর্ধন্য ব্যঞ্জন ‘ড়’ স্থানে দন্ত্য ‘র’, যথা বড় > বর। তাড়নজাত দন্ত্য ‘র’ স্থানে পার্শ্বিক ‘ল’ যেমন, শরীরে > শরীলে। রাজশাহী অঞ্চলে বিশেষত চাপাই নওয়াবগঞ্জ এলাকায় উষ্ম তালব্য ‘শ’ও উষ্ম দন্ত্য ‘স’ ধ্বনির মধ্যে বিভ্রান্তি। স্বরধ্বনির ক্ষেত্রে সম্মুখ প্রসৃত উচ্চমধ্য ‘এ’ এবং নিম্নমধ্য ‘এ্যা’ ধ্বনি, পশ্চাৎ গোলাকৃতি নিম্নমধ্য ‘অ’ এবং উচ্চমধ্য ‘ও’ ধ্বনির মধ্যে বিভ্রান্তি। রাজবংশী বা রংপুরের উপভাষায় অঘোষ মহাপ্রাণ তালব্য ব্যঞ্জন ‘ছ’ এবং উষ্ম দন্ত্য ‘স’, ঘোষ স্বল্পপ্রাণ তালব্য ‘জ’ এবং উষ্ম দন্ত্য ‘য’ নাসিক্য দন্ত্য ‘ন’ এবং পার্শ্বিক ‘ল’, ঘোষ অল্পপ্রাণ দন্ত্য ‘দ’ এবং ঘোষ মহাপ্রাণ দন্ত্য ‘ধ’ ধ্বনির মধ্যে ব্যতিক্রম পাওয়া যায়। পূর্ববঙ্গীয়তে স্পৃষ্ট তালব্য ব্যঞ্জন ‘চ’ ‘ছ’ ‘জ’ ‘ঝ’ এর পরিবর্তে ঘৃষ্ট বা উষ্ম ‘ছ’ এবং ‘য’ ধ্বনি পাওয়া যায়। পূর্ববঙ্গীয়তে কোনো কোনো অঞ্চলে একটি স্বরতস্ত্রীয় স্পৃষ্ট ধ্বনি পাওয়া যায়। সিলেটীতে স্পৃষ্ট কণ্ঠ ‘ক’ এবং স্পৃষ্ঠ্য ‘ফ’ ধ্বনির ঘর্ষণজাত রূপ পাওয়া যায়। পূর্ববঙ্গীয়তে অঘোষ স্বল্পপ্রাণ ‘ক’ এবং মহাপ্রাণ ‘খ’ মধ্য অবস্থানে উষ্ম কণ্ঠ ‘হ’ ধ্বনিতে পরিণত হয়, আদি অবস্থানে ‘হ’ ধ্বনি ঊহ্য থাকে। দক্ষিণ বঙ্গীয়তে স্পৃষ্ট কণ্ঠ ‘ক’ ধ্বনি উষ্মতা প্রাপ্ত হয়। পূর্ববঙ্গীয়তে বর্গের চতুর্থ ধ্বনি ঘোষ মহাপ্রাণ ‘ঘ’, ‘ঝ’, ‘ঢ’, ‘ধ’, ‘ভ’ যথাক্রমে স্বল্পপ্রাণ ‘গ’ উষ্ম ‘য’, স্বল্পপ্রাণ ‘ড’ ও ‘দ’ ধ্বনিতে পরিবর্তিত হয়।

রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য:

উত্তরবঙ্গীয়তে কর্তার বহুবচনে তে বিভক্তি, যেমন- ছাওতে। কর্মে ‘দেক’, যেমন- চাকরদেক; গৌণকর্মে ‘গুণে’ যেমন- আমাকগুয়ে, বাপাকগুণে। অপাদানে ‘ত’, যেমন- কষ্টেত, দেশত। ক্রিয়াপদে অসমাপিতা ‘এ্যা’, যেমন- কর‌্যা, হয়্যা। উত্তমপুরুষে ভবিষ্যৎকালে ‘ইম’ ‘আম’, যেমন- বলিম, করিম। রাজবংশীতে কর্তায় বহুবচনে ‘গুলা’, ‘গিলা’, যেমন- বালকগুলা। সম্বন্ধের বহুবচনে ‘ঘর’- চাকরেরঘর। কর্মকারকে ‘ক’ এবং সম্বন্ধে ‘কার- বালককার। অপাদানে ‘অত’, ‘ওত’- বালকত্। ক্রিয়াপদের রূপ, প্রথম পুরুষ বর্তমান ও পুরাঘটিত ‘ও’, যথা- মুই আছোঁ। অতীতে ‘নু’, আছিনু। ভবিষ্যতে ‘ম’, ‘মু’, ‘মো’, যথা- থাকিমু, থাকিম, থাকমো, থাকম। দ্বিতীয় পুরুষের অতীতে ‘লু’ ‘ল্লু’ ভবিষ্যতে ‘বু’, যেমন- তুই কাইল্লু, তুই করবু। পূর্ববঙ্গীয়তে- কর্মে ‘এরে’, বাপেরে।

সম্বন্ধের বহুবচনে ‘গো’ ছাকরগো, তাগো। কর্মের বহুবচনে ‘রাবে’, আমরারে, তোমরারে। অপাদানে ‘অ’, ‘ত’,- দিল, গলত। ক্রিয়াপদের রূপ, প্রথম পুরুষ ভবিষ্যৎ- ‘মু’, কমু। ময়মনসিংহে ‘রাম’- করবাম। তৃতীয় পুরুষ অতীতে ‘ল’। অসমাপিকাকে ‘আ’, ‘ইয়া’- করিয়া, কইরা। কুমিল্লায় দ্বিত্ব বইল্লা, উইঠ্ঠা। কুমিল্লায় অনির্দেশক ‘তো’ ‘তাম’-করতো, কইতাম। ময়মনসিংহে ‘অত’, ‘বার’- বারত, আইগাইবার। সন্দ্বীপে ‘অন’- করন। সিলেটীতে সম্বন্ধের একবচনে। ‘অর’- গরর। আপাদানে ‘ত’, ‘ও’,-গরত, গরো। কর্তায় বহুবচনে ‘আইন’- গরাইন, ‘টাইন’, গরটাইন। অতীতে মধ্যমপুরুষে ‘লাই’- দেখলাই। তৃতীয়াতে ‘লা’- দেখলা। ভূতার্থ অনির্দেশকে ‘তাম’, ‘তায়’, ‘তা’, ‘তাইন’- খাইতাম, খাইতায়, খাইতা, খাইতাইন। ঘটমান বর্তমানে উত্তমপুরুষে ‘ত্রাম’, ‘ইয়ার’, ‘রাম’- যাইত্রাম, যাইয়ার, যাইরাম। দ্বিতীয় পুরুষে ‘ত্রায়’, ‘ত্রে’,- যাইত্রায়। নির্দেশাত্মক ‘উইন’, ‘উকা’, ‘উক্কা’। অনির্দেশক- ‘তায়’, ‘তে’, যেমন- তুই যাইতায় ছাওহে যাইতো ছায় তাইন যাইতা ছাইন ইত্যাদি।

দক্ষিণ পূর্ববঙ্গীয় চট্টগ্রামীতে কর্তায় ‘এ’, অপাদানের ‘তুন’, সম্বন্ধে ‘অর’, অপাদানে ‘অত’, বহুবচনে ‘গুণ’ ‘উণ’, যথা- কুঁউরগুণ; বর্তমানকালে প্রথম পুরুষে ‘ব’, তৃতীয় পুরুষে ‘তান’। অতীতকালে প্রথম পুরুষে ‘(গ ইয়ম’, গে’, যথা- করগিয়ম, করিয়াম, করগি, অথবা করজিয়ম ইত্যাদি। দ্বিতীয় পুরুষে ‘(গ) ইয়’, ‘লা’; তৃতীয় পুরুষে ‘(গইয়’; ভবিষ্যত কালে ‘(গ) ইউম’, ‘বঅ’, ‘যাম; দ্বিতীয় পুরুষে ‘বে’, অনুজ্ঞা- ‘অ’ না বাচক ‘ইঅ’ যেমন- নকরিঅ। সম্মানবাচক- করওক। অসমাপিকা ‘ইয়ারে’, যথা- গরিয়ারে।

বাংলাদেশের উপভাষাসমূহে রূপতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য অধিক এবং তা নিম্নোক্ত তিনটি ক্ষেত্রে সর্বাধিক,- সর্বনাম, কারক বিভক্তি, ক্রিয়া বিভক্তি। যেমন- সর্বনামে ‘আমি’র উপভাষা রূপ উত্তরবঙ্গে ‘মুই’, নোয়াখালিতে ‘আই’। ‘আমার’, উত্তরবঙ্গে ‘মোর’, নোয়াখালিতে ‘আর’। ‘আমাদের উত্তরবঙ্গে ‘হামার’, ময়মনসিংহে ‘আমরার’, কুমিল্লায় ‘আমাগো’, বরিশালে ‘মোগো’, দক্ষিণবঙ্গে ‘আমরা’ ইত্যাদি।

কারক বিভক্তিতে ‘চাকরদের’, উত্তরবঙ্গে ‘চাকরদেরকে’, পূর্ববঙ্গীয়তে ‘ছাঅরগো’, দক্ষিণবঙ্গে ‘ছঅরগুণ’। ‘গলায়’, পূর্ববঙ্গে ‘গলাত’। ক্রিয়া বিভক্তিতে ‘বলব’, উত্তরবঙ্গে ‘বলিম’, পূর্ববঙ্গে ‘কমু’, দক্ষিণবঙ্গে ‘খইয়ুম’ ইত্যাদি। [Munier Chowdhury, Intermational Journal of American Linguistics. July]

বাংলার উপভাষাগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে শ্রেণিবদ্ধ করবার জন্য নানা চেষ্টা হয়েছে। স্যার জর্জ গ্রীয়ারসন এবং সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এ বিষয়ে তাঁদের গবেষণার ফল বিবৃত করেছেন। আমরা ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব ও পদক্রম আলোচনা করে বাংলা উপভাষাগুলোকে দুটি ভাগে বিভক্ত করতে পারি।

যথা: (১) পাশ্চাত্য, (২) প্রাচ্য

(১) এই পাশ্চাত্য বিভাগে প্রাচীন গৌড় ও রাঢ় অবস্থিত এবং প্রাচ্য ভাগে প্রাচীন বঙ্গ অবস্থিত। পাশ্চাত্য বিভাগকে আবার দুই ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে-

(ক) উদীচ্য: গোয়ালপাড়া হতে পূর্ণিয়া পর্যন্ত। ইহা প্রাচীনকালে কামরূপ ও বরেন্দ্র নামে অভিহিত  হতো। রাজবংশী বা রংপুরী এর একটি প্রশাখা।

‘(খ) দক্ষিণ-পশ্চিম: বর্ধমান ও প্রেসিডেন্সী বিভাগের অধিকাংশ এর অন্তর্ভুক্ত। কুষ্টিয়া জেলা এর

 অন্তর্গত।

(২) প্রাচ্য বিভাগকেও দুই ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে-

(ক) দক্ষিণ-পূর্ব: জেলা ২৪ পরগণার পূর্বাংশ, যশোর জেলা, খুলনা জেলা, ঢাকা বিভাগ এবং এবং নোয়াখালি।

(খ) পূর্ব-প্রান্তিক: কাছাড় হতে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সমস্থ স্থান। নিচে একটি পীঠিকার আকারে উপভাষাগুলোর বৈশিষ্ট্য প্রদর্শিত হলো।

পাশ্চাত্য উপভাষা:

১। মহাপ্রাণ ঘোষবর্ণ- ঘ, ঝ, ধ, ভ ইত্যাদি যথাযথ উচ্চারিত।

২। পূর্ণ অনুনাসিক, যথা- চাঁদ, কাঁদে ইত্যাদি।

৩। একমাত্র তালব্য শ উচ্চারণ (কয়েকটি ‍যুক্তাক্ষর এবং প্রত্যন্ত  পশ্চিম অঞ্চলে স উচ্চারণ)।

৪। কর্মকারকে ’কে’ বা ’রে’ বিভক্তি।

প্রাচ্য উপভাষা:

১। মহাপ্রাণ ঘোষবর্ণের মহাপ্রাণতা লোপ, যথা- ঘ, ধ, ভ স্থানে গ, দ, ব উচ্চারণ।

২। অর্ধ অনুনাসিক, যথা- চান্দ, কান্দে ইত্যাদি।

৩। তালব্য বর্ণ স্থলে দন্ত-তালব্য ঘৃষ্ট বর্ণ।

৪। শ, ষ, স স্থানে হ।

৫। হ লোপ সর্বত্র।

৬। কর্মকারকে  ‘রে’ বিভক্তি।

৭। সকর্মক ও অকর্মক ক্রিয়ার অতীতকালের প্রথম ‍পুরুষ অভিন্ন। নিত্যবৃত্ত অতীতকালের মধ্যম পুরুষের তুচ্ছ  প্রয়োগে ই, যথা, করতি।

              [বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মাওলা ব্রাদার্স-২০১৮, পৃ: ৬২-৬৩]

পৃথিবীর প্রাচীন ও আধুনিক প্রায় সব ভাষারই রয়েছে নানা আঞ্চলিক বৈচিত্র্য- আঞ্চলিক উপভাষা। বাংলা ভাষারও এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেনি। বাংলা ভাষারও প্রধান পাঁচটি উপভাষা রয়েছে। বাংলার পাঁচটি প্রধান উপভাষা ও সেগুলোর অবস্থান মোটামুটি নিম্নরূপ:

 

রাঢ়ী উপভাষা:

রাঢ়ী উপভাষা বা কেন্দ্রীয় প্রমিত বাংলা  ভাষার একটি উপভাষা। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের  বাংলাভাষী মানুষদের কথাবলার মধ্যে এই উপভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই উপভাষার পরিমার্জিত বাংলা রূপকেই বাংলা ভাষার শুদ্ধ লিখন রূপ হিসেবে গণ্য করা হয়।

ভৌগোলিক সীমানা: পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানবাঁকুড়া জেলার পূর্বাংশ, হুগলীহাওড়াকলকাতাউত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগণানদিয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলায় এই উপভাষার প্রচলন লক্ষ করা যায়। এই উপভাষাকে ভিত্তি করে প্রমিত বাংলা গঠন করা হয়েছে।

বৈশিষ্ট্য:

রাঢ়ী উপভাষার সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য অভিশ্রুতি ও স্বরসংগতি। যেমন-

– ‘বলিয়া’>’বলে’, ‘করিয়া’>’করে’, ‘আঁকিয়া’>’এঁকে’ ইত্যাদি হল অভিশ্রুতি জনিত পরিবর্তন।

– দেশি>দিশি, ইংরাজি> ইংরিজি ইত্যাদি স্বরসংগতি জনিত পরিবর্তন।

– চন্দ্রবিন্দুর উচ্চারণ রাঢ়ী উপভাষার খুবই স্পষ্ট। যেমন- চাঁদ, বাঁশ,কাঁটা ইত্যাদি।

 

বঙ্গালি উপভাষা:

এটি অধুনা বাংলাদেশের প্রধান উপভাষা। ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর , বরিশাল, নোয়াখালি র বিস্তির্ণ অঞ্চল জুড়ে আছে এই উপভাষা।
বৈশিষ্ট্য:-

– এ >এয্আ (কেন > ক্যান ) , উ >ও (মুলা > মোলা), ও >উ (দোষ >দুষ) ধ্বনিতে পরিবর্তন ঘটে।

– গৌণকর্মে ‘রে’ বিভক্তি প্রযুক্ত হয়।যেমন- আমারে মারে ক্যান। 

বরেন্দ্রী উপভাষা:

উত্তরবঙ্গের মালদহ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর , বাংলাদেশের পাবনা, বগুড়া ও রাজশাহী জেলার লোকমুখের ভাষা হল এটি।
বৈশিষ্ট্য:-

– অপ্রত্যাশিত স্থানে ‘র’ আগম বা লোপ।যেমন- আম >রাম, রস >অস।

– গৌণকর্মে ‘কে’, ‘ক’ বিভক্তি দেখা যায়। যেমন- হামাক দাও।

ঝাড়খন্ডী উপভাষা:

পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, দক্ষিণ-পশ্চিম বাঁকুড়া ও সিংভূম অঞ্চলে এই উপভাষা প্রচলিত।
বৈশিষ্ট্য:-

– প্রায় সর্বত্র ‘ও’-কার লুপ্ত হয়ে ‘অ’-কারে পরিণত হয়েছে।যেমন- লোক > লক, মোটা>মটা।

– ক্রিয়াপদে স্বার্থিক ‘ক’ প্রত্যয়ের প্রচুর প্রয়োগ।যেমন- যাবেক, খাবেক, করবেক।           

কামরূপী উপভাষা:

পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি , কোচবিহার ; অসমের কাছাড় ; ত্রিপুরা রাজ্য; ও বাংলাদেশের সিলেট , রংপুর অঞ্চলে এটি প্রচলিত। বরেন্দ্রী ও বঙ্গালি উপভাষার মিশ্রণে এই ভাষা গড়ে উঠেছে।
বৈশিষ্ট্য:-

– র এবং ড় ও ন এবং ল-এর বিপর্যয় লক্ষ করা যায়। যেমন- বাড়ি > বারি, জননী > জলনী।

– যৌগিক ক্রিয়াপদে ‘খোয়া‘ ধাতুর ব্যবহার আছে। যেমন– রাগ করা >আগ খোয়া।

[ সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা, ড: রামেশ্ব’র শ, আনন্দ প্রেস পাবলিকেশন্স, কলকাতা- ২০১৪, পৃ:৬৫১-৬৬১]

 

অশিষ্ট বা অপার্থ ভাষা (Slang Language):

অনেকে উপভাষার সঙ্গে অশিষ্ট ভাষার সাধারণ সম্পর্কের উল্লেখ করে থাকেন। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, উভয় ভাষারীতির  মধ্যে একটা স্থানিক বৈশিষ্ট্য থাকলেও ব্যতিক্রম বিদ্যমান। প্রথমত, উপভাষা বিস্তৃত  অর্থে ব্যবহৃত। উচ্চারণ ও রূপমূল উভয় দিক থেকেই উপভাষার বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, কিন্তু অশিষ্ট ভাষা শুধুমাত্র রূপমূলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। দ্বিতীয়ত, ভাষায় অশিষ্টবুলির অল্পমেয়াদী জীবন লক্ষ করা যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অশিষ্ট ভাষা সাম্প্রতিককালে যেমন ব্যবহৃত হয়, তেমনি হঠাৎ করে অদৃশ্যও হয়ে যায়। অন্যদিকে, উপভাষায়  বংশগত ইতিহাস বিদ্যমান। তৃতীয়ত, অশিষ্টভাষা স্বেচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু উপভাষার ক্ষেত্রে এই সূত্র প্রযোজ্য নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তরুণ সম্প্রদায় অশিষ্টভাষা ব্যবহার করে থাকে। অবশ্য, তার অর্থ এই নয় যে, বয়সভেদে ব্যবহার করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে ( ব্রুক , ১৯৬৫ : ২৪)। অশিষ্টভাষা ব্যবহারে বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষিতে বলা যায় যে অশিষ্টভাষা একটা শাখার মধ্যে বিশেষ সম্প্রদায়ের ভাষারূপ।

অঞ্চলভেদে যেমন একই ভাষার মধ্যে অল্পস্বল্প পার্থক্য হয়, তেমনি সামাজিক স্তরভেদেও একই ভাষাভাষী লোকেদের কথায় অল্পবিস্তর পার্থক্য হতে পারে। একজন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, একজন অধ্যাপক, একজন উকিল, একজন রাজনৈতিক নেতা, একজন শ্রমজীবী এবং একজন দাগী অপরাধী গুণ্ডার ভাষার উচ্চারণে ও শব্দ ব্যবহারে বেশ পার্থক্য একে সামাজিক ‍উপভাষা বলতে পারি। আবার সমাজে ইতরজনের, মস্তানদের অপরাধ-জগতের মানুষের ভাষাও অনেকটাও আলাদা। সমাজের ইতরশ্রেণি ও অপরাধীদের মধ্যে গোপন সাংকেতিক ইঙ্গিতপূর্ব যে ভাষা প্রচলিত থাকে তাকে অপার্থ ভাষা বা সংকেত ভাষা বলে।

[সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা, ড: রামেশ্ব’র শ, আনন্দ প্রেস পাবলিকেশন্স, কলকাতা- ২০১৪, পৃ:৬৪৮]

নিষিদ্ধ জগতের ভাষা:

বড় শহরে নিষিদ্ধ জগতের ভাষার বিশেষ কতকগুলো বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। এখানে প্রচলিত ভাষারূপ ইচ্ছাকৃতভাবে ও নিয়মিতভাবে বিভাষার সাহায্যে পরিবর্তন করা হয় যাতে বাইরের লোক এই ভাষার অভ্যন্তরে প্রবেশ না করতে পারে। এভাবে পাশ্চাত্য দেশে “স্বর্ণালঙ্কার” ব্যবহৃত হয় “বরফ” প্রতিশব্দের মধ্য  দিয়ে, অপহৃত স্বর্ণালঙ্কার হয়ে দাঁড়ায় “গরম বরফ”। হেরোইন কোকেনের মত মাদকদ্রব্যও ব্যবহৃত হয় ‘বরফ’ হিসাবে। এখানে লক্ষণীয় যে আমেরিকান অপভাষা অন্যান্য দেশের নিষিদ্ধ জগতের ভাষার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। প্যারিসের ভাষা স্বকীয় বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ হলেও আমেরিকান অপরাধ জগতের ভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। প্যারিসে একসঙ্গে রাহাজানির সময় ‘আমেরিকান রবারী’ শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। বারবনিতার ক্রিয়াকলাপ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। অপরাধজগতের ভাষার বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলে দেখা যায় তাদের শব্দভান্ডারে একটি আন্তর্জাতীয় প্রভাব বিদ্যমান। অবশ্য, অধিকাংশ শব্দের ক্ষেত্রেই দেশীয় ভাষার শব্দের অর্থ ও রূপকালঙ্কার পরিবর্তিত হয়ে থাকে।

আমাদের দেশে অপরাধজগতের ভাষার ওপর বিস্তৃত গবেষণা হয়নি। ভক্তি প্রসাদ মল্লিক বাংলা ও বিহারের অপরাধজগতের ভাষার ওপর গবেষণা করে এদেশের অপরাধজগতের ভাষাভঙ্গির বৈচিত্র্য তুলে ধরেছেন। তাঁর গ্রন্থে অপরাধ জগৎ, তাদের নিষেধ ও কুসংস্কার ও ভাষাভঙ্গি বিশ্লেষিত। তাঁর গ্রন্থ থেকে নিষিদ্ধ জগতের ব্যবহৃত কতকগুলো শব্দের নমুনা উপস্থাপিত হল (১৯৮৫)।

জুঁই                                        মেয়েবন্ধু

ঢোঁড়া                                    মেয়েদের তলপেট

উণডা                                   সুন্দরী

বারুয়া                                   পুলিশের ইনফরমার

ম্যাকড়া                                                বোঝা

কমলি                                   ধর্ষণ

আলগা                                 বিদেশী

ককরো                                 পুলিশ

ফুঙ                                       কোকেন

কলম                                    দরজা-জানালা ভাঙার যন্ত্র

মাস                                       জেলখানা

চাম                                        সুন্দর (১৫-২০ বছরের মেয়ে)

কুকুর                                    ডিটেকটিভ পুলিশ

 

শ্রেণীগত ভাষা ও পেশাগত ভাষা:

ভাষা ও উপভাষার মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করা যায় অনেক সময় তা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে ভাষা ও উপভাষার মধ্যে পার্থক্য ছাড়াও একই সামাজিক স্তরে অবস্থানকারী ভাষাভাষীদের ভাষায় পার্থক্য দৃষ্টিগোচর হয়। এই শ্রেণীর ভাষাকে শ্রেণী ভাষারূপে চিহ্নিত করা যায়। যেমন: মহিলা, নারী, রমণী এই তিনটি রূপমূল ব্যবহারের প্রক্রিয়া লক্ষণীয়। অধিকতর সচেতন ভাষাভাষীরা মহিলা, তারপর নারী এবং অপেক্ষাকৃত স্বল্প-সচেতন ভাষাভাষীরা মহিলা ও নারীর স্থানে স্ত্রী ব্যবহার করতে পারেন। এই শ্রেণীর রূপমূল ব্যবহারে সমাজ সচেতনতার দিক ক্রিয়াশীল। অবশ্য, এই শ্রেণীর রূপমূল ব্যবহারে উপভাষা ও চলিত ভাষাভাষীদের মধ্যেও পার্থক্য  সৃষ্টি করতে পারে। চলিত ভাষায় ‘মহিলা ও নারী’র পরিবর্তে উপভাষীয় অঞ্চল বিশেষে মাতরি, বেটি এবং ‘মেয়ে’র পরিবর্তে ছেড়ি, বেটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ছেড়ি-র মার্জিত রূপমূল ‘ছুড়ি’ চলিত ভাষায় অপেক্ষাকৃত তুচ্ছ বা অবজ্ঞার সঙ্গে ব্যবহৃত। বিভিন্ন সামাজিক স্তরের মানুষের ভাষা ব্যবহার বিভিন্ন আদব-কায়দার প্রতিফলন একটি স্বাভাবিক দিক। এই বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে মানুষের ভাষার বিচারে বিভিন্ন শ্রেণীকরণ প্রচলিত। সামাজিক স্তরে যখন কোন ভাষার পরিবর্তন হয় তখন তা শ্রেণীগত ভাষা হিসাবে পরিচিত। অবশ্য, শ্রেণীগত ভাষার মধ্যেও অনেক ‍রূপান্তর ও অপ্রধান বিভাজন থাকতে পারে।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে, উচ্চবিত্ত পরিবারের একজন তরুণ সদস্য বিশেষ স্কুলে অধ্যয়ন করলে অনেক সময় তার মধ্যে স্বতন্ত্র বিশেষার্থক শব্দ গড়ে তুলতে পারে। উদাহরণে হিসাবে বলা যায় যে, উচ্চবিত্ত পরিবারের একজন তরুণ সদস্য বিশেষ স্কুলে অধ্যয়ন করলে অনেক সময় তার মধ্যে স্বতন্ত্র বিশেষার্থক শব্দ গড়ে তুলতে পারে যা অন্যত্র প্রায় উপলব্ধির অসাধ্য হতে পারে। তা সত্ত্বেও এই ভাষা ও মা-বাবার ভাষার তুলনায় খনিকটা স্বতন্ত্র। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ছাত্রছাত্রীরাও এক ধরনের গোষ্ঠীগত স্কুলে পড়াশোনোর পর বিশেষার্থক শব্দ ভান্ডার গড়ে তোলে।

এক অঞ্চলের উপভাষার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের উপভাষার পার্থক্য নির্দেশে যেমন সীমারেখার সাহায্যে নির্দেশ করা যায়, তেমনি সামাজিক ভাষার শ্রেণীগত দিক নির্দেশে উপভাষার মত সীমারেখার দ্বারা  নির্দেশে সম্ভব না হলেওে, তা অন্যভাবে দেখানো সম্ভব। সামাজিক ভাষার বৈষ্যমের ক্ষেত্রে অধিকাংশ স্থানেই শিক্ষা, রুচিবোধ, সংস্কৃতি, পেশা ও অর্থনৈতিক দিক বিশেষভাবে প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে। অনেক সময়  দেখা যায় সামাজিক ভাষা ব্যবহারকারী ভাষাভাষী বিশ্ববিদ্যালয়ে আর শ্রমিক সমাজে বক্তৃতার সময় দু’শ্রেণীর ভাষারূপ ব্যবহার করে থাকেন উভয় ক্ষেত্রে ভাষারূপের ব্যবধানজনিত কারণে। কিংবা বলা যায় পণ্ডিতজন সমাবেশে আর সুখী সম্মেলনেও সামাজিক ভাষার ব্যতিক্রম লক্ষণীয়। বাংলাদেশ স্বতন্ত্র রাষ্ট্ররূপে জন্ম নেওয়ার পর উচ্চতর সামাজিক বিন্যাস লক্ষ্য করা গেলেও সামাজিক স্তরে সামাজিক ভাষার স্তর নেই। তার কারণ, এই স্তরে সাধারণ চলিত বাংলা, উপভাষা ও  চলিত ভাষার মিশ্র রূপ অথবা ইংরেজি ভাষা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় বাঙালি সমাজে উচ্চতর এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সেই শ্রেণীর স্তর অলক্ষণীয়।

অসামাজিক মূল্যবোধের অভাব, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতি সচেতনতার অভাবই উচ্চতর সামাজিক ভাষা গঠনের পরিপন্থি বলে মনে করা যেতে পারে। একমাত্র ব্যতিক্রম সম্ভবত ব্রিটিশ আমলের উচ্চতর ও অভিজাত শ্রেণীর বয়স্ক ভাষাভাষীর, যাদের মধ্যে সামাজিক ভাষার অস্তিত্ব লক্ষণীয়। সামাজিক ভাষার রূপ বর্তমানে অত্যন্ত সীমিত বলে তার প্রভাব পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ভারত বিভাগের পর পশ্চিম বাংলা থেকে আগত ভাষাভাষীরা নিজেদের মধ্যে চলিত বাংলায় শুদ্ধ রূপটি সংরক্ষিত রাখলেও, তাদের পরবর্তী বংশধররা বাংলাদেশীয় ভাষাগত পরিবেশে গড়ে ওঠার ফলে স্বাভাবিকভাবে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য তাদের ভাষায় অন্তর্নিবেশের জন্যে ভাষাগত পরিবর্তন সাধিত হয়। তার প্রধান করণ, পরবর্তীকালে আঞ্চলিক উচ্চারণের বৈশিষ্ট্যের জন্যে পূর্বতন রূপ সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় নি। যেমন, পশ্চিম বাংলায় ব্যবহৃত ‘উনি হচ্ছেন গিয়ে অধ্যাপক আহমদ’ এই প্রয়োগ বাংলাদেশে অব্যবহৃত।

গ্রেট ব্রিটেনে এবং আরও অনেক দেশে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারে সামাজিক স্তরবিন্যাস লক্ষ্য করা যায়। অনেক সময় দেখা যায় উচ্চতর সমাজে রূপমূল উচ্চারণে এবং লিখিত ভাষায় প্রাচীন রূপ সর্বদা সংরক্ষণ করার অতি আগ্রহী, কিন্তু নিম্নতর সমাজে উচ্চারণগত পরিবর্তন সহজেই গৃহীত হয়ে থাকে। এখনও  অনেক ইংরেজি ভাষাভাষী লিখিত ভাষায় ‘বাট’ দিয়ে বাক্য আরম্ভ অব্যাকরণগত বলে তা ব্যবহার করেন না। তার পরিবর্তে ‘হাউএভা’র যা এই শ্রেণীর রূপমূল দ্বারা বাক্যারম্ভ শুদ্ধ বলে মনে করে থাকেন। যদিও সাম্প্রতিককালে ‘টাইমস’ বা অন্যান্য সংবাদপত্রে ‘বাট’ দিয়ে বহু বাক্য লিখিত হয়। উচ্চতর সমাজে অভিবাদনের সময় ‘প্লিজড টু ইউ’ এবং তার উত্তরে ‘ গ্লাড টু হ্যাভ ইউ নো মি’ ব্যবহৃত হলেও, সাধারণ স্তরে এই প্রয়োগ তেমন প্রচলিত নয়। আমেরিকা ও ক্যানাডায় বিদায় নেওয়ার সময় একজন ‘থ্যাংক ইউ’ বলার সঙ্গে সঙ্গে অন্যজন সৌজন্য জানিয়ে বলেন ‘ইউ আর ওয়েলকাম’।

পেশাগত ভাষার বৈশির্ষ্ট্য:

আঞ্চলিক ভাষা বিন্যাস ও সামাজিক ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি পেশাগত বৈশিষ্ট্যের জন্যেও ভাষার পরিবর্তন সাধিত হতে পারে। অনেক সময় সাধারণ চাকুরিজীবী, ধর্মযাজক, আইনজীবী, সৈনিক, অভিনেতা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভাষাগত বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। প্রত্যেকটি পেশার ক্ষেত্রে উচ্চ স্বরাঘাতপূর্ণ দীর্ঘ বাক্য ব্যবহার প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। অনেক সময় বেতার বা টেলিভিশন ঘোষক-ঘোষিকা, বিশেষত সংবাদ পাঠকের ভাষায় স্বাতন্ত্র লক্ষণীয়। ওয়াল্টার স্কটের ‘রব রয়’ উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়ে ব্যবসায় যে যোগাযোগের ভাষা ব্যবহৃত হয়, তার একটি নমুনা উপস্থাপিত। যেমন:

 ‘your’s recived, and duly honoured the bills enclosed, as per margin.’ বাণিজ্যিক চিঠির শেষেও `your esteemed favour’ শ্রেণীর অতিভাষণ লক্ষণীয়। ব্যবসা ও বাণিজ্যে চিঠিপত্রের ভাষায় যে  সৌজন্য প্রকাশিত হয় বা দ্বিরুক্ত বচন লক্ষ করা যায়, তা বাণিজ্যিক চিঠিতে ব্যবহৃত ভাষার পাশাপাশি চলিত ভাষার মাধ্যমে দেখানো যেতে পারে।

ক.  ‘উক্ত ব্যাপারে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে’।

অর্থ: আমরা আপনার ফাইল হারিয়ে ফেলেছি।

খ. ‘উক্ত ব্যাপারে সক্রিয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’

অর্থ: আমরা ফাইল খোঁজার চেষ্টা করছি।

গ.  ‘আমরা পরিশ্রান্তিকর অনুসন্ধান করছি’।

অর্থ: এ ব্যাপারে আপনার ‍উত্তর পাওয়ার জন্য অনেক দিক অপেক্ষা করতে হবে।

ঘ. ‘আপনার পুনরায় সানুগ্রহ আনুকুল্যের জন্য ধন্যবাদ’।

অর্থ: আপনি ও আপনার অসুবিধের জন্যে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।

 

সংবাদপত্রেও দেখা যায় বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদপত্র বিভিন্ন নামে চিহ্নিত করা হয়। যেমন, দুপুরে প্রকাশিত নগর সংস্করণের জন্যে লিখিত ‘সিটি  এডিসন’, কিন্তু শেষ রাত্রির ‘চূড়ান্ত সংস্করণ’, ‘শেষ সংস্করণ’, ‘অতিরিক্ত শেষ সংস্করণ’- এর ব্যাখ্যা সবসময় অনুধাবন করা কঠিন। সংবাদপত্রে অনেক সময় বেমানান বা বেখাপ্পা তথ্য একটা বাক্যের সাহায্যে লিখিত হয়। যেমন:

  1. Born on May 2, 1904, pipe-smoking Bing is 5ft. 9 ins. Tall, has blue eyes, and brown hair, thinning on top. Always casually and informally dressed, he invariably wears a smile.
  2. Of Irish birth, benign in manner, with the pink complexion and white hair which would as well become a business executive, Mr. Thomposon does not prevaricate.(ব্রুক, ১৯৬৫, ১৭৮)

 

পৃথিবীতে  বিভিন্ন  ভাষাগোষ্ঠী  রয়েছে।  বাংলা  ভাষা  পৃথিবীর  বৃহত্তম  ভাষাগোষ্ঠী  ইন্দো-ইউরোপীয়  ভাষাবংশের  শতম  শাখা  থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এই ভাষাবংশ খ্রিস্টপূর্ব প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ইউরোপে, এশিয়ার ইরান ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিকাশ লাভ করে।  বাংলাদেশ ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই বাংলা ভাষা ব ̈বহৃত হয়। পৃথিবীতে বর্তমানে সাড়ে তিন হাজারের বেশি ভাষা  প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে বাংলা ভাষা অন্যতম। ভাষাভাষীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলা ভাষার অবস্থান চতুর্থ। বাংলাদেশ  ছাড়াও আসাম, ত্রিপুরা, বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ভাষা হলো বাংলা যা বিভিন্ন ‍উপভাষায় সমৃদ্ধ।

বর্তমানে বাংলা ভাষায় কথা বলে এমন লোকের সংখ্যা পৃথিবীতে প্রায় ত্রিশ কোটি।  ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো বাংলাদেশসহ ২৭টি দেশের সমর্থন নিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা  দিবস  হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০০০  সাল  থেকে  জাতিসংঘ  একুশে  ফেব্রুয়ারিকে  আন্তর্জাতিক  মাতৃভাষা  দিবস  হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং ২০০১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বে প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়েছে। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তির মধ ̈ দিয়ে বাংলা ভাষার যে মর্যাদা বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইউনেস্কোর এই ঘোষণার মধ ̈ দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা ও সম্মান আরো সুদৃঢ় হলো।

শিক্ষার্থী: বাংলা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ-৮১০০।

অনুসরণীয় গ্রন্থ:

১। Milka lvich, ‘Linguistic Geography,’ Trends in Linguistics. The Hague, Mouton.

২। Winfred P. Lehmann, ‘Broadening of Language Materials.’ Historical Linguistics. New York, Holt, Rinehart and Winston.

৩। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ‘বাঙলাভাষা আর বাঙালী জাতের গোড়ার কথা,’ বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।

৪। Leonard Bloomfield, Language, New York, Holt, Rinehart & Winston.

৫। John J. Gumperz, Introduction, Directions in Socio Linguistics, New York, Holt, Rinehart & Winston.

৬। সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলা ভাষা, ড: রামেশ্ব’র শ, আনন্দ প্রেস পাবলিকেশন্স, কলকাতা।

 ৭।বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মাওলা ব্রাদার্স।





Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*